এমন নির্লজ্জ আওয়ামী লীগও হতে পারেনি
চাকরির বাজারে এবার ‘ভাইভা কোটা’?

বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় আন্দোলন আর অধিকার আদায়ের স্মৃতি খুব একটা প্রাচীন নয়। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল তরুণ প্রজন্ম। সেই আন্দোলনের বার্তাটি ছিল সোজা এবং স্পষ্ট—মেধার মূল্যায়নে কোনো ধরনের অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল চাকরির পরীক্ষায় নিজেদের যোগ্যতার সঠিক বিচার। অধিকার আদায়ের সেই সংগ্রাম একসময় গিয়ে ঠেকেছিল এক কালজয়ী গণ-অভ্যুত্থানে। রাজপথ উত্তাল হয়েছিল, বুলেট আর ঘামের বিনিময়ে পতন ঘটেছিল এক স্বৈরাচারী শাসনের। রক্তের কালিতে লেখা সেই ইতিহাসের কথা দেশের প্রতিটি মানুষের মনে এখনো একদম তাজা।
কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, সেই অভ্যুত্থানের আলো ছড়ানো পদাঙ্ক পেরিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যেন সেই পুরোনো স্মৃতি খুব দ্রুতই ভুলে গেলেন। চব্বিশের চেতনাকে সামনে রেখে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার করুণ পরিণতি এখন দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে। তরুণ সমাজের মেধার ওপর আবার আঘাত নেমে এসেছে। তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার নতুন আয়োজন শুরু হয়েছে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়। চাকরির মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভায় নম্বরের যে ব্যাপক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেখার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে—সরকার আসলে কী অর্জন করতে চায়?
সম্প্রতি প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, গ্রেডভেদে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। ১১ ও ১২তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে ৪০ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে করা হয়েছে ২৫। সরকারের সিভিল প্রশাসনে কর্মচারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের আওতাভুক্ত। অর্থাৎ দেশের সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার সিংহভাগ জায়গাজুড়েই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে।
এই যে নম্বর বাড়ানোর তোড়জোড়, এ নিয়ে দেশের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের মনে শুরু হয়েছে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক। কারণ ভাইভা বোর্ডের পরিবেশ আর লিখিত পরীক্ষার খাতার মূল্যায়ন কখনো এক জিনিস নয়। লিখিত পরীক্ষা হয় সবার জন্য সমান প্রশ্নপত্রে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট খাতা থাকে, যা প্রয়োজনে পুনরায় খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকে। কিন্তু ভাইভা বোর্ড একেবারেই আলাদা। সেখানে নম্বর দেওয়ার বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে বোর্ডের সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ ও মনস্তাত্ত্বিক মর্জির ওপর। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দেওয়া সম্ভব হয় না। এখন যদি লিখিত পরীক্ষায় নামমাত্র নম্বর পেয়ে একজন প্রার্থী পাস করে আসেন, আর ভাইভা বোর্ডে গিয়ে তাকে বিপুল নম্বরের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়, তবে মেধাবী প্রার্থীর পরিণতি কী হবে, তা বোঝার জন্য খুব বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ভাইভার নম্বর এমন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার সোজা অর্থ দাঁড়ায়, নিয়োগের মূল চাবিকাঠি এখন ভাইভা বোর্ডের হাতে সঁপে দেওয়া হয়েছে। যে প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় দিনরাত এক করে পড়াশোনা করে সেরা নম্বর পেলেন, ভাইভা বোর্ডের কয়েক মিনিটের খেয়ালে তাঁর সব স্বপ্ন ধুলায় মিশে যেতে পারে। পক্ষান্তরে, লিখিত পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করা কোনো পছন্দের বা দলের অনুগত প্রার্থী ভাইভায় অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পেয়ে তালিকার শীর্ষে চলে আসতে পারেন। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ভাইভা বোর্ডকে এখন তৈরি করা হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট ‘চেকপোস্ট’ হিসেবে। যেখানে পরীক্ষা নেওয়া হবে না, বরং পছন্দের মানুষকে চাকরি দেওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করা হবে।
এই ভয়ংকর সত্যটি এখন আর কারও অজানা নয়। দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষই বুঝতে পারছেন, নতুন নিয়মের আড়ালে কী কৌশল আঁকা হচ্ছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিসিএসে ভাইভার নম্বর ২০০ রেখে যেভাবে দলীয় লোক বসানো হয়েছিল, দুর্নীতির মচ্ছব চালানো হয়েছিল, দেশ এখনো তার মাশুল দিচ্ছে। সেই আওয়ামী লীগও কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে এভাবে প্রকাশ্যে ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে অনিয়মের এমন অবাধ আয়োজন করতে সাহস করেনি। কিন্তু বর্তমান সরকার অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সেই ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিল। এ যেন গোপন কোনো বিষয় নয়, একদম প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে নিজেদের লোক বসানোর নতুন ব্যবস্থা চালু করা। মেধা মূল্যায়নের মিষ্টি কথা বলে ক্ষমতায় এসে দলীয়করণের এমন মতলব চালানো সত্যিই এক ঐতিহাসিক পরিহাস।
সরকারের এই বিতর্কিত পদক্ষেপের প্রতিবাদে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছেন। তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো আবার প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠছে। ‘ভাইভার নামে প্রহসন চলবে না’, ‘দলীয়করণের অপর নাম ভাইভাতে নিয়োগদান’—এমন সব স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার কথা, তাঁরা কোনো ধরনের ‘ভাইভা কোটা’ বা পছন্দের লোক বসানোর সিন্ডিকেট মেনে নেবেন না। পরীক্ষা হবে মেধার ভিত্তিতে, দলীয় পরিচয়ে নয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে শুরু হয়েছে প্রচণ্ড তোলপাড়। বিভিন্ন বিরোধী দল ও ছাত্রসংগঠন সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর এই উদ্যোগ মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে। এটি স্পষ্টভাবেই নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যে সরকার নির্বাচনের আগে ভাইভার নম্বর কমানোর কথা বলেছিল, ক্ষমতায় এসে তাদের এমন বিপরীত রূপ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, স্বৈরাচারী হাসিনাকে যেমন তরুণ সমাজ ক্ষমতা থেকে বিদায় করেছে, ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে মেধা ধ্বংসের চেষ্টা করলে এই সরকারকেও চরম খেসারত দিতে হতে পারে।
অবস্থা এতটাই করুণ ও অনভিপ্রেত যে, খোদ ক্ষমতাসীন দল বিএনপি-সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের কেউ কেউ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা হামিম সরকারের এই পদক্ষেপে অনাস্থা প্রকাশ করে এটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, দেশের মানুষের মনে পুরোনো সেই ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও লবিংয়ের ভীতি আবার নতুন করে ফিরে আসছে। যখন ঘরের ভেতরের মানুষও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না যে সরকার কতটা ভুল ও বিতর্কিত একটি পথে পা বাড়িয়েছে।
এত সমালোচনা, প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের পরও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তেমন কোনো আত্মোপলব্ধি চোখে পড়ছে না। সরকারের তরফ থেকে নানা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে লিখিত পরীক্ষায় নানা ধরনের জালিয়াতি বা প্রক্সি রোধ করতেই নাকি ভাইভার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, প্রযুক্তির অনিয়ম ঠেকানোর উপায় কি ভাইভায় ইচ্ছেমতো নম্বর বাড়ানো, নাকি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা? ভাইভার নম্বর বাড়ালে তো জালিয়াতি কমবে না, বরং স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের নতুন দরজা খুলে যাবে।
আরও আশঙ্কার কথা হলো, বিসিএসের বাইরে ১০ম গ্রেডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার অজুহাতে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। পিএসসির মতো একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে কিংবা তার কাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে যেভাবে সরকারি নিয়োগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা সুশাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। সরকারি চাকরি কোনো দলের কর্মীদের পুরস্কৃত করার জায়গা হতে পারে না। এটি একটি রাষ্ট্রের সম্পদ। এখানে নিয়োগ হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে।
সরকারের মনে রাখা উচিত, ছাত্র ও তরুণ সমাজ তাদের অধিকারের বিষয়ে কতটা সংবেদনশীল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি এখনো মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। ক্ষমতার মোহে পড়ে সেই ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে যাওয়া কোনো দূরদর্শী সরকারের কাজ হতে পারে না। তরুণদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন করে, ভাইভার ভয়াবহ ফাঁদ পেতে যদি ভাবা হয় যে সবকিছু নীরবে মেনে নেওয়া হবে, তবে সরকার ভুলের স্বর্গে বাস করছে। অধিকার হরণকারী প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি ভয়াবহ পরিণতি থাকে। ইতিহাস সাক্ষী, যে সরকার তরুণদের দাবির মুখে পিঠ দেখিয়েছে কিংবা তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তাদের শেষ রক্ষা কখনোই হয়নি।
শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করা উচিত। অনতিবিলম্বে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর এই অন্যায্য ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ার সর্বত্র নিরপেক্ষতা, মেধা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। সরকার যদি এখনো সুবুদ্ধির পরিচয় না দেয় এবং এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে রাজপথের যে আগুন নিভে গেছে বলে তারা মনে করছে, সেই আগুন আবার জ্বলে উঠতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আর সেই আগুনে কাদের কী ক্ষতি হবে, তা নতুন করে বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।









