পে-স্কেল: উৎসবে আমলা শ্রেণি, চাপে কোটি মানুষ
খরচ রাষ্ট্রের, মাশুল জনগণের

সকালের রোদের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে লোকজনের ভিড় বাড়ে। চালের বস্তা, সবজির ঝুড়ি কিংবা তেলের বোতলের দিকে তাকিয়ে মানুষের চোখ থমকে যায়। পকেটের খুচরা টাকা গুনে একটা হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ। যে হিসাব কোনো দিনই মেলে না। এরই মধ্যে আকাশে নতুন এক মেঘের আনাগোনা। সরকার নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে। পে-স্কেল নামে পরিচিত এই ঘোষণার পর থেকে সরকারি অফিসের পিয়ন থেকে বড় সাহেবদের মুখে আনন্দের হাসি ফোটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাজারের ধুলোবালি মাখা সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠেছে। তাদের কাছে এই নতুন বেতন কাঠামো যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে? যাদের আয় বাড়েনি এক টাকাও, যাদের নিত্যদিনের বাজার করাটা একেকটা ছোটখাটো যুদ্ধের মতো। তাদের কথা ভেবেছে কে?
সরকারের হিসাব বলছে, এই নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে প্রতি বছর অতিরিক্ত লাগবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এটি এককালীন কোনো মেগাপ্রকল্পের খরচ নয়। এটি স্থায়ী ব্যয়, যা প্রতি বছর রাষ্ট্রের কাঁধে চেপে বসবে। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, এত বিপুল পরিমাণ টাকা আসবে কোথা থেকে? অর্থনীতির ভেতরের খবর যারা রাখেন, তারা চিন্তায় কপাল কুঁচকাচ্ছেন। চলতি অর্থবছর শেষ হতে না হতেই রাজস্ব আদায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি ঝুলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের খাতায় টানাপোড়েন স্পষ্ট।
এমনিতেই জ্বালানি সংকট আর ব্যবসায় মন্দার কারণে কর আদায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সরকার বলছে, দুই বা তিন ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে এই বেতন ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। কিন্তু তাতেও মূল সত্যটা ঢাকা পড়ছে না। টাকার জোগান দিতে সরকারকে এখন তিনটি বিষম পথ বেছে নিতে হবে। হয়তো নতুন করে বিপুল পরিমাণ টাকা ছাপাতে হবে, ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নিতে হবে, না হয় উন্নয়ন বাজেটের টাকা কাটছাঁট করতে হবে।
ব্যাংক থেকে যদি সরকার টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি শিল্পমালিকরা ঋণ পাবেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা না হলে নতুন চাকরি তৈরি হবে না, পুরোনো চাকরিজীবীদের বেতন বাড়া তো দূরের কথা। আর যদি সরকার নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারের আগুন নেভাতে চায়, তবে সেই আগুন আরও দ্বিগুণ হয়ে বাজারে ছড়িয়ে পড়বে। এমনিতেই চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির থাবায় মানুষ দিশেহারা। গত জুলাইয়েও মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। এবার এই পে-স্কেলের প্রভাবে সেই মূল্যস্ফীতি কোন আসমানে গিয়ে ঠেকবে, তা ভেবে সাধারণ মানুষের কপালে ঘাম ছুটছে।
বাজারের নিয়ম বড় অদ্ভুত। নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হতে হয়তো আরও কয়েক মাস বা বছর লাগবে। কিন্তু তার আগেই বাজারের অসাধু ব্যবসায়ী আর বাড়ির মালিকেরা নিজেদের হিসাব কষে ফেলেছেন। চালের কেজি, লিটারপ্রতি তেল কিংবা বাসাভাড়ার দাম অলিখিতভাবেই বাড়তে শুরু করেছে। একে বলা যায় মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি। সরকারি কর্মকর্তা হয়তো মাস শেষে বাড়তি টাকা হাতে পাবেন, বাজারে পাঁচ টাকা বেশি দিতে তাঁর গায়ে লাগবে না। কিন্তু যে লোকটা কোনো ছোট দোকানে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে চাকরি করে, সে কোথায় যাবে? বেসরকারি খাতে তো পে-স্কেলের সঙ্গে মিলিয়ে এক লাফেই বেতন দ্বিগুণ করার কোনো নিয়ম নেই। তাদের আয় থাকবে আগের জায়গায়, কিন্তু খরচের খাতাটা বড় হয়ে যাবে কয়েক গুণ।
সমাজটা এখন যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীরা যেন এক সুরক্ষিত দ্বীপের বাসিন্দা। মহামারির সময় যখন লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল, ছোট ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে পথের খাতায় নাম লিখিয়েছিল, তখন সরকারি কর্মচারীরা শতভাগ বেতন ও ভাতা নিয়ে ঘরে নিরাপদ ছিলেন। আর এখন, যখন চড়া মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন তাঁদের হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত শতভাগ বেতনের উপহার। সমাজের এই বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনের ভেতর জন্ম দিচ্ছে ক্ষোভের। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যে তরুণেরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়েছিল, তাদের অনেকেই ছিল দিন এনে দিন খাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। সেই বৈষম্যের অনুভূতি যদি আরও গভীর হয়, তবে রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য তা কতটুকু সুখকর হবে?
সরকারের তরফ থেকে অবশ্য বারবার বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি নাকি সামলে নেওয়া হবে। তথ্য উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলনে এসে মৃদু স্বরে স্বীকার করেছেন যে, কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ভারসাম্য রক্ষার কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু মুখের কথায় তো আর চিড়ে ভেজে না। রান্নার হাঁড়িও চড়ে না। সত্যিটা হলো, বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার যদি এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক সুরক্ষার বাজেট থেকে টাকা কেটে এনে পে-স্কেলের খাতে জমা করে, তবে দেশের জরুরি সেবা খাতের মান ধসে পড়বে। হাসপাতালে বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়া বন্ধ হবে, স্কুলে পড়ালেখার খরচ বাড়বে। আখেরে সেই আঘাতটাও এসে পড়বে এই সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর।
১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা, আর সর্বোচ্চ ছিল ২ হাজার টাকা। ৫৩ বছর পর সেই সর্বনিম্ন বেতন গিয়ে ঠেকেছে ২০ হাজার টাকায়, আর সর্বোচ্চ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই দীর্ঘ সময়ে বেতন বেড়েছে প্রায় ১৫৪ গুণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারের এই বিপুল খরচ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার মান কি একবিন্দুও বেড়েছে? সরকারি দপ্তরে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষকে যে হয়রানির শিকার হতে হয়, ঘুষ না দিলে যে কাজ আটকে থাকে, তার কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের দক্ষতা বাড়ানো কিংবা জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এই বেতন বাড়ানোর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়নি। জনগণ তাদের ঘামের টাকায় কর দেবে, আর আমলারা বাড়তি সুবিধা ভোগ করে আগের মতোই কাজ ঝুলিয়ে রাখবে—এই ব্যবস্থার নাম কি ভারসাম্য?
সরকারের হাতে এখন পথ খুব একটা খোলা নেই। তারা যদি কেবল আমলাতন্ত্রকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীকে উপোসের মুখে ঠেলে দেয়, তবে তার পরিণতি অর্থনীতি বা সমাজ কাউকেই ভালো জায়গায় নিয়ে যাবে না। পে-স্কেল না দিয়ে হয়তো সরকারের উপায় ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতর যে চাপ তৈরি হচ্ছিল, তা সামাল দেওয়া রাজনৈতিকভাবে জরুরি ছিল। কিন্তু যাদের ওপর ভর করে একটা দেশের আসল চাকা ঘোরে, সেই কৃষক, শ্রমিক, ছোট দোকানদার, বেসরকারি কর্মচারী—তাদের সম্পূর্ণ আড়ালে ঠেলে দিয়ে এমন একপক্ষীয় উৎসব আয়োজন করা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না।
ব্যয় কমানোর নানা পথ ছিল। অপ্রয়োজনীয় সরকারি বিভাগ বন্ধ করা যেত, বিলাসিতা কমানো যেত, আমলাদের অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কিংবা ভাতার নামে টাকা তোলার রাস্তা বন্ধ করা যেত। কিন্তু সেসব কঠিন পথে না হেঁটে সরকার সহজ পথটাই বেছে নিয়েছে—ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া আর জনগণের কাঁধে মূল্যস্ফীতির অদৃশ্য কর চাপিয়ে দেওয়া।
আজকের বাজারে এসে একজন সাধারণ পিতা যখন সন্তানের হাতে পছন্দের খাবারটা তুলে দিতে পারেন না, যখন মাস শেষে বাসাভাড়া শোধ করার পর পকেটে কেবল শূন্যতা আটকে থাকে, তখন নতুন পে-স্কেলের খবর তাঁর কাছে কোনো সরকারের সফলতা বলে মনে হয় না। তাঁর মনে হয়, এ যেন এক বিরাট তামাশা। যে তামাশায় কেবল গুটিকতক মানুষ হাসে, আর বাকি বিরাট জনগোষ্ঠী অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে কোনো অর্থনীতিই দীর্ঘদিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।









