সরকারের আয়ের প্রধান হাতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরকে নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়—এই দুই পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেনি বিএনপি সরকার। ফলে অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে এনবিআর আবার আগের কাঠামোতেই ফিরে যায়। অথচ চার মাসও পেরোয়নি, এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন—এনবিআরকে আবারও ভাগ করা হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই উপলব্ধি কি নতুন? মোটেই নয়। এনবিআরকে নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিভক্ত করার আলোচনা বহু পুরোনো। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো সরকারই এই পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রধান কারণ ছিল আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধ এবং এনবিআরের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ।
সবার নিশ্চয় মনে আছে, ইউনূস সরকারের সময় এনবিআরকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তারা তীব্র আন্দোলনে নেমেছিলেন। শুধু আন্দোলনই নয়, দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রমও কার্যত স্থবির করে দিয়েছিলেন তারা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। এমনকি বিশ্বের অনেক দেশেও যুদ্ধ বা চরম জাতীয় সংকট ছাড়া রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রথমত, সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তাদের আন্দোলনের অধিকার ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করা। সেই অবস্থান থেকে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম অচল করে দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। একটি সরকার টিকে থাকে জনগণের করের টাকায়। রাজস্ব আদায় বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যায় এবং সরকারি সেবাদান ব্যবস্থা সংকটে পড়ে। ফলে এনবিআরের আন্দোলন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।
পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন ইউনূস সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর আন্দোলনের গতি অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়েছিল। যদিও তাদের অধিকাংশই পরে তুলনামূলকভাবে হালকা প্রশাসনিক শাস্তি নিয়ে পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন।
বিএনপি সরকার তখন এনবিআর বিভক্তির অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেনি। যুক্তি ছিল নানা ধরনের। কিন্তু বাস্তবতা এখন তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কারণ, একই প্রতিষ্ঠান যদি একদিকে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করে এবং অন্যদিকে সেই নীতির বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা আলাদা। কারণ, যে সংস্থা করনীতি তৈরি করবে, তার কাজ হওয়া উচিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যবসাবান্ধব কাঠামো এবং জাতীয় রাজস্ব প্রয়োজন বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্যদিকে যে সংস্থা কর আদায় করবে, তার দায়িত্ব হবে সেই নীতি কার্যকর করা। কিন্তু যখন একই প্রতিষ্ঠান উভয় দায়িত্ব পালন করে, তখন জবাবদিহি দুর্বল হয় এবং স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এই কাঠামোতে কর প্রশাসনের মধ্যে একধরনের অস্বচ্ছ ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা একই হাতে থাকলে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের সঙ্গে অসুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠার ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ এমনভাবে প্রভাবিত হতে পারে, যাতে বাস্তবায়নের পর্যায়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদিও সব কর্মকর্তা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নন, তবুও কাঠামোগত দুর্বলতা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তাদের অন্যতম সুপারিশ ছিল নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব প্রশাসনকে আলাদা করা। ইউনূস সরকার রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও এই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন অনেকেই এটিকে অপ্রয়োজনীয় বা তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আজ একই পথে হাঁটার প্রয়োজনীয়তা বিএনপি সরকারও অনুভব করছে।
আমার ধারণা, কেবল অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা নয়, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের চাপও এই উপলব্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বৈদেশিক ঋণ, বাজেট সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজস্ব খাতের সংস্কার এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংখ্যাগুলোও সেই বাস্তবতার কথাই বলছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১১ মাসে আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। কিন্তু অর্জন যতই রেকর্ড হোক, লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান এখনো বড়।
অন্যদিকে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, এর কাছাকাছি পৌঁছাতেও কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটালাইজেশন এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বজায় রেখে এই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
ফলে বাস্তবতা সরকারকে শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাতেই ফিরিয়ে এনেছে, যেখান থেকে কয়েক মাস আগে সরে এসেছিল। এনবিআরকে ভাগ করার প্রয়োজনীয়তা নতুন কোনো আবিষ্কার নয়; বরং এটি বহুদিনের স্বীকৃত একটি সংস্কার এজেন্ডা। পার্থক্য শুধু এই যে, আগে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিরোধের কারণে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজস্ব সংগ্রহের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সেই সিদ্ধান্তকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে প্রকৃত প্রশ্নটি কেবল এনবিআর ভাঙা না ভাঙার নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি কর প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমিয়ে একটি পেশাদার, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে? কারণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করলেই সংস্কার সম্পন্ন হয় না। কাঠামোর পাশাপাশি যদি কাজের সংস্কৃতি, জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বদলায়, তাহলে নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। এনবিআর ভাগ হলেও যদি পুরোনো মানসিকতা ও চর্চা বহাল থাকে, তাহলে কয়েক বছর পর আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসবে—সংস্কার হলো কোথায়?
তাই একে সংস্কারের নতুন সূচনা বলার চেয়ে বিলম্বিত বোধোদয় বলাই হয়তো অধিক যথাযথ। কারণ যে বাস্তবতা আজ সরকার উপলব্ধি করছে, সেই বাস্তবতা অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ বহু বছর আগেই চিহ্নিত করেছিলেন। প্রশ্ন এখন আর এনবিআরকে ভাগ করা হবে কি না, বরং প্রশ্ন হলো—সংস্কারটি কত দ্রুত, কত কার্যকরভাবে এবং কতটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে?
বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?