বিএনপি কি সত্যিই গুম বন্ধ করতে চায়?
আবারও কি ফিরবে সেই গুমের সংস্কৃতি!

বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও বিচার নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর করে। গঠন করা হয় স্বাধীন গুম তদন্ত কমিশন। জারি করা হয় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ। ওই অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, গুমের অভিযোগের তদন্ত কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না রেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে রাখা। কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ ছিল। গোপন বন্দিশালা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে।
এর উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকে দিয়ে যেন সেই অভিযোগের তদন্ত না করানো হয়। বিশেষ করে গুমের মতো ঘটনায় এই স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকে। ফলে তদন্তও যদি একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে পাস না হওয়ায় অকার্যকর হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও ভালো আইন করা হবে। কিন্তু সম্প্রতি সংসদে যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে স্বাধীন তদন্তের সেই কাঠামোই আর থাকছে না।
নতুন বিলে বলা হয়েছে, কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দল দিয়ে তদন্ত করাবে। শুনতে এটি নিরপেক্ষ মনে হলেও বাস্তবে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, এক বাহিনীর পরিবর্তে অন্য বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করালেই কি তদন্ত স্বাধীন হয়ে যায়?
গুমের ঘটনায় অতীতে এমন অভিযোগও এসেছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিচয় গোপন করে মানুষকে তুলে নিয়ে যেতেন। কখনো এক বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অন্য বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী পরিবার কীভাবে নিশ্চিত হবে, তাদের স্বজনকে কোন বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে?
আর যদি সেই তদন্তের দায়িত্ব অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—তদন্ত কি সত্যিই সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকবে? এক বাহিনীকে বাদ দিয়ে অন্য বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেই কাঠামোগত স্বার্থের সংঘাত দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা কোথায়?
এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গুমের মতো ঘটনার সঙ্গে অনেক সময় ক্ষমতাসীন সরকারই জড়িত থাকে। ফলে সরকারের অধীনে থাকা পুলিশ দিয়ে সেই সরকারের বা সহযোগী কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করা কঠিন। তার মতে, এতে বিচার পাওয়ার বদলে তদন্তপ্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
গুম-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার সরকারের হাতে রাখার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, একই পক্ষ যদি তথ্য সংরক্ষণ করে, তদন্ত নিয়ন্ত্রণ করে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে, তাহলে তথ্যের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও। তিনি মোংলার জেলে মিরাজ শেখের ঘটনাটি সামনে এনেছেন। পরিবারের অভিযোগ, চলতি বছরের এপ্রিলে কোস্টগার্ডের সদস্যরা মিরাজ শেখকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর সাড়ে চার মাস পার হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ জিডি নিলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। উচ্চ আদালত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেও মিরাজের সন্ধান মেলেনি। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কোনো ঘটনা গুম হিসেবে স্বীকার করলেই কি শুধু সেটির তদন্ত হবে? নাকি একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তাকে খুঁজে বের করা এবং কী ঘটেছে তা নিশ্চিত করা?
মিরাজ শেখের ঘটনা যদি গুম না হয়, তাহলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা সম্ভব। আর যদি গুমের অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা দরকার। কিন্তু তদন্তই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সত্যটা বেরিয়ে আসবে কীভাবে?
নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে আরেকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেখানে গুমের অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীর জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ ঠেকানোর যুক্তি থেকে এই বিধান আনা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে এটি ভুক্তভোগীদের জন্য নতুন ভয় তৈরি করতে পারে।
গুমের ঘটনায় সাধারণ মানুষের হাতে খুব বেশি প্রমাণ থাকে না। একজন স্বজন নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার সাধারণত জানে না তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, কোন গাড়িতে নেওয়া হয়েছে কিংবা কারা তাকে নিয়ে গেছে। এসব তথ্য থাকার কথা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কাছে। ফলে অভিযোগের পুরো প্রমাণ সংগ্রহের দায়িত্ব যদি ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর পড়ে, তাহলে তাদের পক্ষে সত্য প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ধরা যাক, একটি পরিবার অভিযোগ করল, তাদের স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো একটি সরকারি সংস্থাকে। সেই সংস্থা তদন্ত করে বলল, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপর অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারার কারণে যদি ওই পরিবারের সদস্যের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আর কত পরিবার গুমের অভিযোগ করার সাহস করবে?
এই প্রশ্নই তুলেছেন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা যদি তার স্বামীর গুমের বিচার চেয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং পুলিশ তদন্ত করে তা প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে কি তাকেই পাঁচ বছরের জন্য জেলে যেতে হবে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার এমনিতেই ভয়, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে থাকে। তার ওপর অভিযোগ করলেই আইনি শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হলে তারা শেষ পর্যন্ত চুপ করে যেতে পারেন। এতে গুম প্রতিরোধের আইন কি সত্যিই গুম প্রতিরোধ করবে, নাকি গুমের অভিযোগ কমিয়ে দেবে—সেটিই এখন ভাবার বিষয়।
একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকারের আনা মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে সরকারের প্রভাব বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারের বিরুদ্ধেই যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে, তখন সেই অভিযোগের তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে?
মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য, গুম প্রতিরোধে শুধু আইন করলেই হবে না। সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অন্তর্বর্তী সরকারের গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক প্রধান ও সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুমের মতো অপরাধ বন্ধ করতে হলে স্বাধীন সংস্থার অধীনে তদন্ত করতে হবে। কারণ, গুমের ঘটনায় অপরাধীরা প্রায়ই নিজেদের পরিচয় গোপন করে। তাই সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে শুধু আইন করেও কোনো লাভ হবে না।
আওয়ামী লীগ আমলের দেড় দশকে গুম হওয়া দেড় হাজারের বেশি মানুষের ঘটনা তদন্ত করে কমিশন বলেছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং এর পেছনে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখনো ২৫১ জন মানুষ নিখোঁজ। তাদের পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
এই ২৫১ জন শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে ২৫১টি পরিবার। রয়েছে মা-বাবার অপেক্ষা, স্ত্রী-সন্তানের অপেক্ষা, ভাই-বোনের অপেক্ষা। অনেক শিশু বড় হয়েছে বাবাকে না দেখে। অনেক স্ত্রী আজও জানেন না, তিনি স্বামীর ফেরার অপেক্ষা করবেন, নাকি তার অনুপস্থিতিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেবেন।
গুমের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা এখানেই—এটি পরিবারকে শোক করার সুযোগও দেয় না, আবার আশাও ছাড়তে দেয় না।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মানুষ আশা করেছিল, নতুন বাংলাদেশ এই অমানবিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। গুম হওয়া মানুষদের খুঁজে বের করা হবে। অপরাধীদের বিচার হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী আর কখনো নাগরিককে আইনের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না। তদন্ত হবে স্বাধীন এবং বিচার হবে স্বচ্ছ। কিন্তু এখন যদি স্বাধীন তদন্তের বদলে আবারও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
র্যাব বিলুপ্ত করার মতো কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হলেও শুধু একটি বাহিনী পরিবর্তন বা পুনর্গঠন করলেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সংস্কৃতি বদলায় না। বদলাতে হয় পুরো জবাবদিহির কাঠামো। নিশ্চিত করতে হয় স্বাধীন তদন্ত। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের তদন্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হয়। এখানেই বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের বিরুদ্ধে বিএনপি দীর্ঘদিন কথা বলেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান দাবি করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ফলে ক্ষমতায় এসে তাদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি।
ক্ষমতার বাইরে থেকে যে প্রশ্ন করা সহজ, ক্ষমতায় গিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই আসল পরীক্ষা। বিএনপি যদি সত্যিই গুমের সংস্কৃতির অবসান চায়, তাহলে সেই সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে আইন ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে। গুমের অভিযোগের তদন্ত স্বাধীন করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর স্বাধীনতা দিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর বদলে নিরাপত্তা দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণের অসম্ভব ভার তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার পদ বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তাকে রক্ষা করা যাবে না।
কারণ, গুমের বিচার শুধু নিখোঁজ মানুষগুলোর পরিবারের বিচার নয়। এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও পরীক্ষা।
ক্ষমতার পরিবর্তন যদি শুধু সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্র না বদলায়, তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী? একটি সরকার চলে গেল, আরেকটি সরকার এলো—কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা যদি আগের মতোই অনিশ্চিত থাকে, তাহলে মানুষ শেষ পর্যন্ত কী পেল?
ফ্যাসিবাদ শুধু একটি দলের নাম নয়। ক্ষমতাকে জবাবদিহির বাইরে রাখার সংস্কৃতিও ফ্যাসিবাদের অংশ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করাও সেই সংস্কৃতির অংশ। তাই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই হবে না; বদলাতে হবে সেই সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীনদের আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়। বিএনপির সামনে এখন সেই সুযোগই আছে।
তারা চাইলে প্রমাণ করতে পারে, ক্ষমতার পরিবর্তন সত্যিই রাষ্ট্রের চরিত্রেও পরিবর্তন এনেছে। তারা চাইলে গুমের সব অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে। গুমের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারে। কিন্তু উল্টো পথে হাঁটলে বিপদ শুধু বিএনপির নয়, পুরো রাষ্ট্রের।
আজ যদি গুমের তদন্ত আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীর হাতে থাকে, অভিযোগকারীরা শাস্তির ভয় পান, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং নিখোঁজ মানুষের সন্ধান না মিললেও সরকার দায় এড়িয়ে যেতে পারে—তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই, ক্ষমতা বদলেছে, নাকি শুধু ক্ষমতাবান বদলেছে?
গুমের ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই ক্ষতের ওপর ক্ষমতার পুরোনো ছায়া পড়তে দেওয়া উচিত নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গুম ছিল সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি। এই অভিযোগের বিচার না হলে শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই বঞ্চিত হবে না, রাষ্ট্রও তার অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হারাবে।
আর বিএনপি যদি ক্ষমতায় এসে একই ধরনের সংস্কৃতিকে অন্য কোনো নামে টিকিয়ে রাখে, তদন্তের স্বাধীনতা কমিয়ে দেয় কিংবা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে সামলানোর চেষ্টা করে, তাহলে ইতিহাসের কাছে তাদেরও কঠিন জবাব দিতে হবে। কারণ, বিচারহীনতা কোনো সরকারের স্থায়ী ঢাল নয়।
ক্ষমতা বদলায়। সরকার বদলায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে গুমের ভয় মুছে যায় না। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়—গুমের বিচার কি সত্যিই স্বাধীনভাবে হবে, নাকি ক্ষমতার পুরোনো ছায়াই নতুন বাংলাদেশকে আবারও ঢেকে ফেলবে? এই প্রশ্নের উত্তর বিএনপিকেই দিতে হবে। আর সেই উত্তর শুধু কথায় নয়, আইন, প্রতিষ্ঠান ও কাজে দিতে হবে।









