সংসদে ৬ আইন পাশ করল সরকার
নানা ইস্যুতে সমালোচনামূখর বিরোধী দল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপ্তিকে ঘিরে বৃহস্পতিবার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ছিল মুখোমুখী। তবে তেমন একটা উত্তেজনার রেশ ছিল না। সরকার একদিকে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, রোহিঙ্গা ইস্যু, ভারত-বাংলাদেশ যোগাযোগ ও সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে; অন্যদিকে বিরোধী দল সংসদে রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেছে। দিনের সামগ্রিক রাজনৈতিক চিত্রে সংসদ এবং সংসদকেন্দ্রিক বক্তব্যই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।
সরকারের কার্যক্রম
সংসদের সমাপনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের সাম্প্রতিক লংমার্চের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ করলেই যদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হতো, তাহলে সরকারই আগে এমন কর্মসূচি নিত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে না দেখে সমাধানের চেষ্টা করছে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমালোচনা করে তিনি বিগত সরকারের নীতিকে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের রেল কর্তৃপক্ষের তিন দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে চালানোর বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ আলোচনা তুললেও বাংলাদেশ জানিয়েছে, আন্তদেশীয় ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রধান বক্তা থাকবেন বলে সংসদে জানানো হয়।
এদিকে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে নয় কার্যদিবস পর। অধিবেশনে বিভিন্ন বিধিতে নোটিশ, প্রশ্নোত্তর ও বিল উত্থাপনসহ একাধিক সংসদীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রীকে মোট ১৪৪টি প্রশ্ন করা হয়, যার মধ্যে ১৫টির উত্তর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য করা ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে; বিরোধী দল থেকে মাত্র একটি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের জন্য অস্বস্তিকর একটি বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে ভারত থেকে আমদানি করা চালের একটি চালান। ক্ষতিকর আফলাটক্সিনের উপস্থিতির সন্দেহে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে খাবার অনুপযোগী ৯৮৪ টন চাল সরবরাহকারীকে ফেরত দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
বিরোধী দলের কার্যক্রম
বিরোধী দলের প্রধান রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল সংসদের সমাপনী অধিবেশনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা ও তিস্তার পানি, গণভোট, সংবিধান সংস্কার, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, দুর্নীতি, শিক্ষা, শিল্প ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা ও সম্পর্ক থাকবে, তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠে আসে।
একই দিনে নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সংসদ ভবনে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের বিস্তারিত আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা না হলেও এটি বিরোধী দলের কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও জামায়াত আপত্তি জানিয়েছে। দলটির দাবি, এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ দুর্বল হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়তে পারে। অন্যদিকে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ দশম গ্রেডের কিছু নিয়োগ পিএসসির বাইরে নেওয়ার সম্ভাব্য উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন।
সংসদে বিরোধীদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেছেন, অধিবেশনে ভিন্নমত প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অপমানজনক ভাষার মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি বিরোধী দলের কতটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন সংসদীয় বিধির আওতায় তাদের নোটিশ কতটা গৃহীত হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় এসেছে।
দিনের রাজনৈতিক চিত্র
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের রাজনীতি ছিল মূলত সংসদকেন্দ্রিক। সরকার বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সংসদীয় কার্যক্রমে নিজেদের অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল পররাষ্ট্রনীতি, নিয়োগব্যবস্থা, সংসদে রাজনৈতিক স্পেস এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সংসদ অধিবেশন শেষ হলেও দিনের বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট, সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন সংসদের ভেতরের বিতর্কের পাশাপাশি অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মতো ইস্যুতেও বিস্তৃত হচ্ছে।









