মীর শাহে আলম। এক দশক আগেও দেশের উত্তর জনপদের রাজনীতিতে তাঁর নাম ছিল মাঝারি সারির। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরেছে। গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তাঁর উত্থান যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বগুড়া-২ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে যিনি ছিলেন একজন সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, আজ তিনি সরকারের অন্দরমহলে পরিচিত অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী হিসেবে।
ক্ষমতার এই অবস্থানে পৌঁছানোর পর থেকেই প্রতিমন্ত্রীর আচরণে যেন এক ধরনের অপ্রতিরোধ্য কর্তৃত্ববোধের প্রকাশ ঘটছে। তাঁর নির্বাচনী এলাকা বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রবেশ করলেই সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের চিত্র চোখে পড়ে। রাস্তার মোড়, বাজার, ল্যাম্পপোস্ট, এমনকি দেয়ালের পর দেয়ালজুড়েও তাঁর হাস্যোজ্জ্বল প্রতিকৃতি। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং গুরুতর নৈতিক স্খলনের এক অন্ধকার অধ্যায়। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম শুধু নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেননি, বরং দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারকেও ফেলেছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে। দেশের ইতিহাসে এমন অভূতপূর্ব ঘটনা আগে ঘটেছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিমন্ত্রীর এলাকার দুটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে তাঁর দুই সন্তানের নামে। একটি ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’ এবং অন্যটি ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের নামও মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। এ ছাড়া আরেকটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে তাঁর পারিবারিক পদবি যুক্ত করে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’।
সংসদে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম যে ব্যাখ্যা দেন, তা আরও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তিনি দাবি করেন, নতুন ইউনিয়নের নামের সঙ্গে তাঁর সন্তানদের নাম নাকি অলৌকিকভাবে মিলে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের গণশুনানির ভিত্তিতেই নাকি এই নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর যুক্তি ছিল, নামের আগে ‘মীর’ শব্দটি নেই, তাই এটিকে তাঁর সন্তানদের নাম বলা যাবে না। এমন অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষ তো বটেই, তাঁর নিজের দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরাও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিদ্রূপের সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি সরকারের জন্য এতটাই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন। বিতর্কের মুখে তিনি ইউনিয়ন দুটির নাম অবিলম্বে পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় নাম পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজের মায়ের নামেও কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে চান না, সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।” সংসদ অধিবেশনে প্রতিমন্ত্রীর দুর্বল ও অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হন।
তবে প্রতিমন্ত্রীর এই নামকরণের প্রবণতা শুধু ইউনিয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। শিবগঞ্জ উপজেলার ৫৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় মুছে দিয়ে সেখানে প্রতিমন্ত্রীর নাম যুক্ত করার এই প্রচেষ্টার পেছনেও স্থানীয় প্রশাসনের তোষামোদির সংস্কৃতির অভিযোগ উঠেছে।
যদিও সমালোচনা তীব্র হলে প্রতিমন্ত্রী একটি আধা-সরকারি পত্রের মাধ্যমে দাবি করেন, তাঁর অজান্তেই স্বার্থান্বেষী একটি মহল এটি করেছে। কিন্তু ওই চিঠিতেই বেরিয়ে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেন, তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নামে ইতোমধ্যে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মীরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতগাড়ি মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, মীর লাবনী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দীর্ঘ এই তালিকা প্রমাণ করে, নিজের এবং পরিবারের নাম স্থায়ী করার প্রবণতা কতটা গভীরে প্রোথিত।
শাহে আলমের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশ করায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপরও নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগ। প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামসহ ছয়জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন ও চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ রেজানুর ইসলামকে গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে প্রতিমন্ত্রী তড়িঘড়ি করে বিবৃতি দিয়ে জানান, মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পরে ব্যাপক চাপের মুখে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি আপস-মীমাংসার দিকে যায় এবং রোববার আদালত থেকে ওই সাংবাদিক জামিন পান। তবু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিমন্ত্রীর আশপাশের প্রভাবশালী মহলের নীরব সমর্থন ছাড়া একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে এভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা কতটা সম্ভব?
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রশাসনিক সমালোচনাকেও ছাড়িয়ে গেছে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ। সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিজ নির্বাচনী এলাকায় এমন পরিমাণ প্রকল্প নিয়েছেন, যার ধারেকাছে দেশের অন্য কোনো উপজেলা নেই। গত চার মাসে সড়ক, পথ ও সেতু নির্মাণে শিবগঞ্জ উপজেলা একাই পেয়েছে ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প। অথচ দেশের প্রায় শতাধিক উপজেলা একই সময়ে একটি টাকার প্রকল্পও পায়নি। শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে প্রায় ২০টি উপজেলার সমপরিমাণ বরাদ্দ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গাজীপুরের কালীগঞ্জ পেয়েছে মাত্র ৩২ কোটি টাকা, যা শিবগঞ্জের অর্ধেকেরও কম। সমগ্র দেশের ৩৭৩টি উপজেলা যেখানে গড়ে প্রায় পৌনে চার কোটি টাকার প্রকল্প পেয়েছে, সেখানে শিবগঞ্জকে দেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী সুবিধা।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্যটি হলো, নির্বাচনের আগে এই বগুড়াতেই এক পথসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জেলা-কেন্দ্রিক পক্ষপাতের অবসান ঘটানো হবে। তিনি বলেছিলেন, সরকার গঠন করলে শুধু নিজের এলাকার কথা চিন্তা করলে চলবে না; সমগ্র দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর ‘শিবগঞ্জ মডেল’ প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বগুড়া জেলার সড়ক ও সেতু উন্নয়নে যত অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি একাই পেয়েছে শিবগঞ্জ। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক নিবাস হিসেবে পরিচিত গাবতলী উপজেলাও পেয়েছে মাত্র ২০ কোটি টাকা, যা শিবগঞ্জের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
এই উন্নয়ন-যজ্ঞের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি লুকিয়ে আছে প্রকল্প বণ্টনের ধরনে। শিবগঞ্জের এই বিপুল বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে খোদ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের কাছে। এককভাবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের প্রকল্প পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং’। সীমান্ত নিজেও শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। পিতার মন্ত্রণালয়ের সাড়ে ১৩ কোটি টাকার কাজ একাই পেয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান, যা উপজেলার মোট প্রকল্পের প্রায় ১৮ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এসব প্রকল্পের কয়েকটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছেন খোদ প্রতিমন্ত্রী।
স্বার্থের এই স্পষ্ট দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার আগেই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমমোক্তারনামার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা লভ্যাংশ হস্তান্তর করা যায় না; কেবল প্রতিনিধি নিয়োগ করা যায়। আরও বিস্ময়ের বিষয়, প্রতিমন্ত্রীর উদ্বোধন করা ভিত্তিপ্রস্তরগুলোতে এখনও প্রোপ্রাইটর হিসেবে মীর সীমান্তের নামই উল্লেখ রয়েছে।
ছেলের বাইরে বাকি বরাদ্দের সিংহভাগ গেছে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাদের প্রতিষ্ঠানের কাছে। শিবগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি বুলবুল ইসলাম এবং উপজেলা যুবদলের সভাপতির বোনের প্রতিষ্ঠানসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সাতটি প্রতিষ্ঠানের ভাগে পড়েছে মোট বরাদ্দের ৫৩ শতাংশ। আর এই সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে লিমিটেড টেন্ডার মেথড (এলটিএম)। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়াতে বড় বড় প্রকল্পকে কৃত্রিমভাবে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে, যাতে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়া যায়। ৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পকে ১৬টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠান, বাকিগুলো পেয়েছে দলীয় নেতাদের প্রতিষ্ঠান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষকদের মতে, সীমিত দরপত্র পদ্ধতির অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেও যদি একই পথ অনুসরণ করে, তাহলে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক ও নৈতিক সার্থকতা কোথায়? আওয়ামী আমলের ‘গোপালগঞ্জ মডেল’ এবং বর্তমানের ‘শিবগঞ্জ মডেল’-এর মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতারাও এখন এই শাহে আলম-কাণ্ডে স্পষ্টতই বিব্রত। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে মামলা-হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করে যে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা টিকে ছিলেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র চার মাসের মাথায় কয়েকজন ব্যক্তির আচরণ সেই দীর্ঘ ত্যাগের রাজনৈতিক মূল্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, শত শত নির্যাতিত নেতা এখনও কোনো সুযোগ পাননি, অথচ কেউ কেউ ক্ষমতার শীর্ষে বসেই দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। জনগণ এসব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, এবং এর রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত পুরো বিএনপিকেই বহন করতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশায়। কিন্তু সরকারের শুরুতেই যদি একজন প্রতিমন্ত্রীর পরিবার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয় উন্নয়নের নামে বিশেষ সুবিধা ভোগের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা দ্রুতই হতাশায় রূপ নিতে পারে। বিএনপি যদি এখনই স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে না পারে, তবে রাজনৈতিকভাবে তাদেরও কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
শাহে আলমের এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন মডেল’ প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের নয়; এটি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার এক আত্মঘাতী মডেল। এমন একটি ধারা অব্যাহত থাকলে তা শুধু সরকারের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজিও দ্রুত ক্ষয় করবে। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেন কি না, নাকি অতীতের সরকারগুলোর মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রশ্রয়ের রাজনীতিই আবারও প্রাধান্য পায়।
বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে?
বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?