হাসিনার দিন তবে সত্যিই শেষ হলো!

রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই।
একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
রাজনীতির নির্মম পরিহাস বোধ হয় একেই বলে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা সম্ভবত ভেবেছিলেন, এটি সাময়িক বিরতি মাত্র। দিল্লির আশ্রয় হবে তার প্রত্যাবর্তনের নিরাপদ ঘাঁটি। ভারত তার পাশে থাকবে, আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াবে, আর একসময় কোনো না কোনো পথে তিনি আবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসবেন।
কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা হারানোর পর পুরনো হিসাব আর পুরনো থাকে না। আজকের বাস্তবতা বলছে, শেখ হাসিনার সেই প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন শুধু দূরে সরে যায়নি; বরং তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্যটিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দিল্লির দরজায় দাঁড়িয়ে শেষ ভরসাটুকুও ফুরোল
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের শেষ আশ্রয় ছিল দিল্লি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে পুরনো নিয়মটি তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন—রাষ্ট্রের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, চিরস্থায়ী স্বার্থ আছে।
ভারত শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেছে। কেন করেছে, সেটিও কারও অজানা নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট সরকারকে দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিরাপত্তা, সীমান্ত, যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেছে। ফলে শেখ হাসিনার সরকার যতটা বাংলাদেশের জন্য ছিল, তার চেয়েও বেশি ভারতের কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট সেই সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে।
একজন ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে বাংলাদেশের ১৭ কোটির মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি ভারত কতদিন নেবে? এই প্রশ্নই এখন দিল্লির সামনে। কারণ বাংলাদেশের সরকার বদলেছে, রাজনীতির সমীকরণ বদলেছে, জনমত বদলেছে। পুরনো কৌশল আঁকড়ে থাকলে ভারত নিজেই বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
দিল্লি সেটা বুঝতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ সম্ভবত ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর আগমন। একজন পেশাদার কূটনীতিকের বদলে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির একজন প্রবীণ রাজনীতিককে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিজেই একটি রাজনৈতিক বার্তা। এরপর তার ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ, বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের তৎপরতা আরও বড় বার্তা দিয়েছে।
বার্তাটি খুব সরল—ভারত এখন আর শুধু শেখ হাসিনার বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে চায় না; তাকে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।
এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পৌঁছে যাওয়াও সেই পরিবর্তিত কূটনৈতিক বাস্তবতারই ইঙ্গিত বহন করে।
ঢাকাও এবার পুরনো ভাষায় কথা বলছে না। বার্তাটি পরিষ্কার—একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক নয়। সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, জনগণের সঙ্গে জনগণের। মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বার্থের ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে জায়গায় একসময় শেখ হাসিনা ছিলেন সম্পর্কের কেন্দ্র, সেখানে এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিই কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
শেখ হাসিনার জন্য এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক পরাজয়ের বার্তা আর কী হতে পারে?
দিল্লির দ্বিমুখী খেলা, আর ঢাকার ধাক্কা
তবে ভারত যে এক লাফে পুরনো সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন বাস্তবতায় চলে এসেছে, এমন সরল হিসাব করাও ঠিক হবে না। কূটনীতিতে দরজা একেবারে বন্ধ করা হয় না। বিশেষ করে যখন সেই দরজার ওপাশে দীর্ঘদিনের মিত্র থাকে।
দিল্লি সম্ভবত একই সঙ্গে দুটি হিসাব কষেছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, আবার আওয়ামী লীগকেও পুরোপুরি পরিত্যাগ করবে না। অর্থাৎ একদিকে ঢাকার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জন্য ভারতের মাটিতে সীমিত রাজনৈতিক স্পেস—এমন একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা থাকতে পারে।
কিন্তু এখানেই ঢাকার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এবার স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো পক্ষকে সক্রিয় হতে দিলে সেটি মেনে নেওয়া হবে না।
এরপর যা ঘটল, সেটি নিছক একটি অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনা নয়। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে নিয়ে যে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে দিল্লি পুলিশ গিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয়। অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে ব্যারিকেড দিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
কেন? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে খুব বেশি রাজনৈতিক পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এর আগে একই ক্লাবে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। ঢাকা তার প্রতিবাদ করেছে। এরপর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেল।
এগুলো কাকতালীয় ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু রাজনীতিতে কাকতালীয় ঘটনাগুলোও কখনো কখনো অনেক কিছু বলে দেয়। ভারত যদি সত্যিই আওয়ামী লীগকে আগের মতো রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করত, তাহলে দিল্লির মাটিতে আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো দৃশ্য দেখার কথা ছিল না।
বরং এখানে দিল্লির নতুন বার্তাই বেশি স্পষ্ট—আশ্রয় দেওয়া এক জিনিস, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে দেওয়া আরেক জিনিস।
শেখ হাসিনা ভারতে থাকতে পারেন। কিন্তু ভারতকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য তার ঘাঁটিতে পরিণত করতে দেওয়া হবে না—ঢাকার অবস্থান সম্ভবত এতটাই স্পষ্ট ছিল যে দিল্লিকেও তার হিসাব বদলাতে হয়েছে।
ডিসেম্বরে ফিরবেন? রাজনীতির মঞ্চে আর দর্শকও নেই
কয়েক মাস আগেও আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে ঘোষণা আসছিল, ডিসেম্বরেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন। এমনকি তাকে ঘিরে এমন একটি রাজনৈতিক আবহ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল যেন তিনি শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছেন।
কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে ফিরে আসতে হলে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হয় না। দরকার সংগঠন, জনসমর্থন, রাজনৈতিক বৈধতা এবং মাঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে চারটির কোনোটিই এখন আগের জায়গায় নেই।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ কারাগারে, অনেকে আত্মগোপনে, অনেকে দেশের বাইরে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছত্রভঙ্গ। দলের সামনে নেই কোনো দৃশ্যমান গণআন্দোলন। নেই এমন কোনো রাজনৈতিক ঢেউ, যার ওপর দাঁড়িয়ে একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতা দেশে ফিরে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠতে পারেন।
তার ওপর রয়েছে আইনি বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, তার বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলাসহ বিপুলসংখ্যক মামলা এবং দেশে ফিরলে গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে তার প্রত্যাবর্তন এখন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি একটি আইনি প্রশ্ন।
তাহলে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের গল্প কী ছিল?
সম্ভবত সেটি ছিল রাজনৈতিক মনোবল ধরে রাখার গল্প। দলের ভাঙা কর্মীদের বোঝানোর গল্প। পরাজিত একটি সংগঠনকে স্বপ্ন দেখানোর গল্প।
কিন্তু রাজনীতিতে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য খুব নির্মম।
একসময় বলা হচ্ছিল, শেখ হাসিনা ফিরবেন বিজয়ীর বেশে। এখন শেখ হাসিনা নিজেই বলছেন, দেশে ফিরলে তিনি অন্যদের বিপদে ফেলতে চান না।
এই একটি বাক্যই অনেক কথার সমান।
এক সাক্ষাৎকারেই বদলে গেল সব সুর
শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক এখানেই। দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্যে আগের সেই দৃঢ়তা নেই। নেই দ্রুত দেশে ফেরার ঘোষণা। নেই আগের মতো রাজনৈতিক হুঙ্কার। বরং রয়েছে অপেক্ষা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
যে শেখ হাসিনা এতদিন বলতেন তিনি দেশে ফিরবেন, সেই শেখ হাসিনাই এখন বলছেন, নিজের ফেরার কারণে কাউকে বিপদে ফেলতে চান না।
রাজনীতির ভাষা বুঝতে হলে কখনো কখনো শব্দের চেয়ে নীরবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। এখানে সেই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি কথা বলছে।
দেশে ফেরার ঘোষণা থেকে এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলা হচ্ছে। এটিই হলো রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের মতো হামলার আশঙ্কার কথা বলেছেন।
অর্থাৎ শেখ হাসিনা নিজেই এখন স্বীকার করছেন, বাংলাদেশে তার প্রত্যাবর্তন কোনো বিজয় মিছিলের বিষয় নয়; বরং নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকির বিষয়। এখানেই তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট।
একসময় রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল তার হাতে। আজ রাষ্ট্রে ফেরার পথেই রাষ্ট্রীয় আইনের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তাকে প্রকাশ্যে বলতে হচ্ছে। ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে যে নেতা অন্যদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতেন, ক্ষমতার বাইরে এসে তাকেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
ইতিহাস কখনো কখনো এমন নিষ্ঠুর প্রতিশোধই নেয়।
‘শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই’—তাহলে বিকল্প কে?
আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণটি ঘটেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে। গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের ভেতরে সবচেয়ে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মিথ ছিল—শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। এই ধারণাটি শুধু প্রচার করা হয়নি; রাজনৈতিকভাবে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে আওয়ামী লীগ মানেই শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা মানেই আওয়ামী লীগ।
দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বলয়ের বাইরে শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ কমেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল একজন মানুষ। আর এখন সেই মানুষটিকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে—আপনি না থাকলে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন? এবং শেখ হাসিনা নিজেই বলছেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার অনুপস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ নেতা দায়িত্ব পালন করবেন। আলোচনায় আসছে শেখ সেলিমের নাম।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ‘কোনো বিকল্প নেই’ থেকে ‘আমার অনুপস্থিতিতে অমুক দায়িত্ব পালন করবেন’—এই দুই বক্তব্যের মধ্যে একটি পুরো রাজনৈতিক যুগের দূরত্ব রয়েছে। এখানে শুধু একজন নেতার অনুপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে ছাড়াও আওয়ামী লীগ টিকে থাকতে পারে।
এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
অবশ্য শেখ সেলিমের নাম সামনে আসার মধ্যেও আওয়ামী লীগের পারিবারিক রাজনীতির ছাপ রয়েছে। কিন্তু সেটি এই মুহূর্তের মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো—শেখ হাসিনা নিজেই প্রথমবারের মতো নিজের রাজনৈতিক অনুপস্থিতিকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বীকার করছেন।
এমন স্বীকারোক্তি তখনই আসে, যখন একজন নেতা বুঝতে পারেন যে তিনি আর আগের অবস্থানে নেই।
ভারত কি তাহলে হাসিনাকে বিসর্জন দিচ্ছে?
রাজনীতিতে ‘বিসর্জন’ শব্দটি হয়তো কঠিন। কিন্তু ভূরাজনীতির অভিধানে এটি অস্বাভাবিক নয়। ভারত শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেছে তাদের স্বার্থে। এখন যদি সেই স্বার্থের হিসাব বদলে যায়, তাহলে দিল্লি কেন একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাতে যাবে?
যে রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে না। ভারতও করবে না। কারণ, বাংলাদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ আর শেখ হাসিনা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটাই সম্ভবত দিল্লি এখন বুঝতে শুরু করেছে।
দিল্লি যদি দেখে, শেখ হাসিনাকে আঁকড়ে থাকার কারণে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং সাধারণ জনগণের বড় অংশ ভারতের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হয়ে উঠছে, তাহলে একসময় তাকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভারতের জন্যই লাভজনক। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই হিসাবেরই ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকায় নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি সীমিত হচ্ছে।
আর শেখ হাসিনা?
তিনি নিজেই বলছেন, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা। ক্ষমতার শেষ দৃশ্যটি কখনো মসনদে হয় না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পতন ২০২৪ সালের আগস্টেই দৃশ্যমান হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পতন আর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি এক বিষয় নয়।
কেউ ক্ষমতা হারিয়েও ফিরে আসতে পারেন। ইতিহাসে তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। তাই প্রশ্ন ছিল—শেখ হাসিনা কি আবার ফিরবেন? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ঢাকার রাজপথের দিকে তাকালে হবে না। তাকাতে হবে দিল্লির কূটনৈতিক করিডর, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্যের দিকে।
তিন জায়গা থেকেই একই ধরনের সংকেত আসছে। দিল্লি বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে। আওয়ামী লীগ তার পুরনো সাংগঠনিক শক্তি হারিয়েছে। আর শেখ হাসিনা নিজেই এখন নিজের দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে শর্তাধীন ও অনিশ্চিত করে তুলছেন।
এগুলো কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একই রাজনৈতিক গল্পের আলাদা আলাদা অধ্যায়। সেই গল্পের নাম—একটি যুগের অবসান। যে শেখ হাসিনা একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিজের চারপাশে ঘুরিয়েছেন, আজ তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে আলোচিত হচ্ছে।
যে আওয়ামী লীগ একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন ছিল, আজ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে শেখ হাসিনা ছাড়া দলটি কতটা টিকতে পারবে, সেই প্রশ্নে। যে ভারত একসময় শেখ হাসিনার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ছিল, আজ সেই ভারতকেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কের হিসাব করতে হচ্ছে। এটাই ইতিহাসের চাকা।
ক্ষমতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সে কতটা শক্তিশালী। আর ক্ষমতা চলে গেলে ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—কেউই অপরিহার্য নয়। শেখ হাসিনা হয়তো ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে থাকবেন। তার শাসন, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, তার সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক এবং ক্ষমতার ধরন নিয়ে বহু বছর গবেষণা হবে। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ে জায়গা পাওয়া আর সক্রিয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে থাকা এক কথা নয়।
আজকের বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নেই। আওয়ামী লীগের ওপর তার আগের মতো কার্যকর নিয়ন্ত্রণও নেই। দেশে ফেরার পথ আইনি ও রাজনৈতিকভাবে কঠিন। আর যে দিল্লিকে তিনি শেষ আশ্রয় ভেবেছিলেন, সেই দিল্লিও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পথেই হাঁটছে।
তাহলে আর বাকি থাকে কী?
সম্ভবত শুধু আনুষ্ঠানিক পর্দা নামার অপেক্ষা। কারণ রাজনৈতিক জীবনের এপিটাফ কখনো একজন নেতা নিজে লেখেন না। সময় সেটি লিখে দেয়। কখনো রাজপথে, কখনো ব্যালট বাক্সে, কখনো আদালতের রায়ে, আবার কখনো একজন পুরনো মিত্রের বদলে যাওয়া আচরণে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে হয়তো সেই এপিটাফ লেখা শুরু হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, সেই এপিটাফের প্রথম কয়েকটি শব্দ যেন তিনি নিজেই উচ্চারণ করে ফেলেছেন—আমি এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যে নেত্রী একসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, আজ তাকেই পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এটাই পতন। এটাই রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা।
আর সব হিসাব-নিকাশ শেষে প্রশ্নটি এখন আর শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ কীভাবে টিকে থাকবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি তাকে বাদ দিয়ে কোন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে। সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে এখন আর খুব বেশি সংশয়ের অবকাশ নেই— শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সূর্য অস্তমিত হয়েছে। এবার শুধু ইতিহাসের পাতায় রাত নামার অপেক্ষা।









