বরিশাল জামায়াতে বড় ধাক্কা, দুই মাসুদে রক্ষা
দুই আসনের জয়, ১৯টিতেই পরাজয়

বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
সম্প্রতি বরিশাল বিভাগের প্রায় প্রতিটি জেলা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। নির্বাচনের ফলাফল এবং মাঠের বাস্তবতা পাশাপাশি রাখলে মনে হয়েছে, বিষয়টি শুধু বিএনপির শক্তির নয়। বরং বরিশালে জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী বাছাই এবং স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে দলের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
৮৫ বছরের একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য একটি পুরো বিভাগে ২১ আসনের মধ্যে মাত্র দুটিতে জয় পাওয়াকে তাই নিছক নির্বাচনী পরাজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই ফলাফল থেকে জামায়াতের জন্য কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
দুই মাসুদ যে প্রশ্ন রেখে গেছেন
পিরোজপুর-১ আসনে মাসুদ সাঈদী এবং পটুয়াখালী-২ আসনে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের জয় এই ফলাফলকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। কারণ একই দল, একই প্রতীক, একই নির্বাচন। অথচ অধিকাংশ আসনে পরাজয়ের বিপরীতে এই দুই প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? এখানেই প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সামনে আসে।
একটি রাজনৈতিক দলের সংগঠন যত শক্তিশালীই হোক, সংসদ নির্বাচনে ভোটারকে শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থীকেই বেছে নিতে হয়। তার ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক সম্পর্ক, এলাকায় উপস্থিতি, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে অবস্থান ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। দুই মাসুদের জয় অন্তত একটি বিষয় দেখিয়েছে—জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তির সঙ্গে শক্তিশালী ব্যক্তিগত নেতৃত্ব যুক্ত হলে বরিশালেও জয় সম্ভব।
অন্যদিকে ১৯টি পরাজয় প্রশ্ন তুলছে, অধিকাংশ আসনে সেই সমন্বয়টি কেন তৈরি হলো না।
বরিশালের রাজনীতির নিজস্ব হিসাব আছে
বরিশালের রাজনীতি শুধু দলীয় প্রতীকের হিসাব দিয়ে বোঝা কঠিন। এই অঞ্চলের বহু আসনে ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রভাব রয়েছে। বিএনপির বড় সুবিধা এখানেই। বহু আসনে তাদের প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী নিজেই দলের বাইরে একটি ভোটভিত্তি তৈরি করেছেন।
জামায়াতের ক্ষেত্রে সংগঠন শক্তিশালী হলেও সব আসনে প্রার্থীরা একই ধরনের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেননি। এটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
দলের নিবেদিত কর্মী থাকা এবং নির্বাচনে জেতার মতো বিস্তৃত ভোটভিত্তি থাকা এক কথা নয়। নির্বাচনে জয় পেতে হলে দলের প্রচলিত সমর্থকদের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ ও ভিন্নমতের ভোটারদেরও আকৃষ্ট করতে হয়। বরিশালের ফলাফল বলছে, এই জায়গায় জামায়াতের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বিএনপির আধিপত্যকে অজুহাত বানালে চলবে না
বরিশালের প্রায় সব আসনেই বিএনপির শক্ত অবস্থান জামায়াতের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু এটিকে পরাজয়ের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানো ঠিক হবে না। কারণ পিরোজপুর-১ এবং পটুয়াখালী-২-এর ফলাফলই তার বিপরীত উদাহরণ। প্রতিদ্বন্দ্বী একই ছিল, রাজনৈতিক পরিবেশও একই। তারপরও সেখানে জামায়াত জয় পেয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিপক্ষের শক্তির পাশাপাশি নিজের সক্ষমতার প্রশ্নটিও সামনে আনতে হবে। বিএনপি কতটা শক্তিশালী, সেটি জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু কোন আসনে কাকে প্রার্থী করা হবে, কত আগে থেকে তাকে মাঠে নামানো হবে এবং মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা তৈরি করা হবে—এসব দলটির নিজেদের সিদ্ধান্ত।
সবমিলিয়ে বরিশালের ফলাফল থেকে জামায়াতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে প্রার্থী বাছাই। মনোনয়ন দেওয়ার সময় শুধু সাংগঠনিক আনুগত্য, দীর্ঘদিনের দলীয় ভূমিকা কিংবা কেন্দ্রের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে বিবেচনা করলে হবে না। নির্বাচনে জেতার বাস্তব সক্ষমতাও সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—প্রার্থীকে এলাকার মানুষ কতটা চেনে? দলের বাইরে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? স্থানীয় সামাজিক ও পেশাজীবী পরিসরে তার যোগাযোগ কেমন? তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে তার অবস্থান কী? তিনি কি পাঁচ বছর ধরে মাঠে থাকার মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচনের কয়েক মাস আগে খোঁজা শুরু করলে দেরি হয়ে যাবে।
বরং যেসব আসনে বর্তমান প্রার্থীরা প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেননি, সেখানে এখন থেকেই বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির কথা ভাবা উচিত। প্রয়োজনে প্রার্থী পরিবর্তনও রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে হবে। দলীয় আনুগত্য একজনকে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা দিতে পারে, কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বাউফলের শিক্ষা
পটুয়াখালী-২ আসনের বাউফল এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের জয় দেখিয়েছে, একটি আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ স্থির নয়। সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একজন প্রার্থী দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করলে দলীয় ভোটের বাইরেও সমর্থন তৈরি করতে পারেন। জামায়াতের উচিত বাউফলের সাফল্যকে শুধু একটি বিজয় হিসেবে না দেখে এর পেছনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করা।
কীভাবে প্রার্থী মানুষের কাছে পৌঁছেছেন, কীভাবে সংগঠনকে কাজে লাগিয়েছেন, কোন শ্রেণির ভোটারকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন এবং স্থানীয় রাজনীতির কোন জায়গায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন—এসবের উত্তর অন্য আসনেও কাজে লাগতে পারে। পিরোজপুর-১-এর ক্ষেত্রেও একই বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
দুটি জয়কে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে শিক্ষা সীমিত থাকবে। বরং এগুলোকে জামায়াতের জন্য দুটি পরীক্ষিত মডেল হিসেবে দেখা উচিত।
ভোটের রাজনীতি শুধু জাতীয় ইস্যুতে হয় না
জামায়াতের রাজনীতির একটি বড় শক্তি তার আদর্শিক অবস্থান ও সংগঠন। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় স্থানীয় বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। বরিশালের মানুষের কাছে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, কৃষি, মৎস্য, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন প্রার্থী যদি এসব প্রশ্নে নিয়মিত মানুষের পাশে থাকেন, তাহলে তার রাজনৈতিক পরিচয় শুধু দলের প্রার্থী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি স্থানীয়ভাবে একজন গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। জামায়াতের জন্য এখানেই জনসম্পৃক্ততার বড় সুযোগ।
দলের সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে যদি স্থানীয় সমস্যার সমাধান ও মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে আরও দৃশ্যমানভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর নির্বাচনী প্রভাব পড়তে পারে।
এখনই আত্মপর্যালোচনার সময়
জামায়াতে ইসলামীর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বরিশালের ফলাফল নিয়ে আসনভিত্তিক পর্যালোচনা হওয়া দরকার। কোথায় ভোট কমেছে, কোথায় প্রার্থী প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, কোথায় সংগঠন ভোটে রূপান্তরিত হয়নি, কোথায় বিএনপির স্থানীয় নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রেখেছে এবং কোথায় ব্যক্তিগত প্রার্থী জনপ্রিয়তা ফলাফল বদলেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে বের করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে জয়ী দুই আসন এবং বড় ব্যবধানে পরাজিত আসনগুলো পাশাপাশি রাখলে হয়তো সমস্যার জায়গাগুলো আরও পরিষ্কার হবে। এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কাউকে দায়ী করা নয়। বরং পরবর্তী নির্বাচনের আগে কোন জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে, কোথায় নেতৃত্ব বদলাতে হবে এবং কোন প্রার্থীদের আরও সময় দিতে হবে, সেটি নির্ধারণ করা।
হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, একটি নির্বাচনে পরাজয় কোনো দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একই ধরনের দুর্বলতা চিহ্নিত হওয়ার পরও যদি তা সংশোধন করা না হয়, তখন সেটি রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়। বরিশালে জামায়াতের সামনে এখন সেই পরীক্ষা।
তারা চাইলে ১৯টি পরাজয়ের দায় বিএনপির শক্তির ওপর দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারে। আবার চাইলে এই ফলাফলকে নিজেদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিতে পারে। আমার মনে হয়, দ্বিতীয় পথটাই তাদের জন্য বেশি জরুরি। কারণ দুই মাসুদের জয় দেখিয়েছে, বরিশালে জামায়াতের সম্ভাবনা আছে। আর ১৯টি পরাজয় দেখিয়েছে, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো প্রস্তুতি অধিকাংশ আসনে যথেষ্ট ছিল না।
পরবর্তী নির্বাচনের আগে তাই সময়কে কাজে লাগাতে হবে। যোগ্য প্রার্থী চিহ্নিত করতে হবে, স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে এবং নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি আসনকে একই ছকে দেখা যাবে না। বরিশালের ২১টি আসনের জন্য ২১টি আলাদা রাজনৈতিক হিসাব দরকার। রাজনীতিতে পরাজয় শেষ কথা নয়। কিন্তু পরাজয় থেকে শিক্ষা না নেওয়া বড় বিপদ। বরিশাল জামায়াতে ইসলামীর সামনে সেই শিক্ষাটিই রেখে গেছে। দুই আসনের জয় তাদের স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু ১৯টি পরাজয় তাদের আত্মপর্যালোচনায় বাধ্য করা উচিত।
(লেখাটি ইষৎ সংযোজিত)









