আদানি চুক্তি: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি দায়?

গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের করা বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তি করা হলেও এর বিভিন্ন শর্ত, সক্ষমতা ব্যয়, ন্যূনতম বিদ্যুৎ ক্রয় এবং কয়লার মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদে কী পরিমাণ আর্থিক দায় বহন করতে হবে, সেটিও স্পষ্টভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে চুক্তির আর্থিক ও আইনগত দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ বিষয়টি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার নয়; এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একটি দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে সক্ষমতা ব্যয় থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত রাখার সক্ষমতার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিশোধের পরিমাণ কত এবং এর ঝুঁকি কে বহন করছে? যদি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা কমে যায়, সস্তা বিকল্প উৎস তৈরি হয় অথবা দেশের নিজস্ব উৎপাদন বাড়ে, তারপরও যদি বড় আর্থিক দায় বহন করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার নমনীয়তা কমে যায়। ভবিষ্যতের সরকার তখন বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এটাই সক্ষমতা ব্যয় ও ন্যূনতম বিদ্যুৎ ক্রয়ের মতো শর্তের সবচেয়ে বড় কৌশলগত উদ্বেগ। আজকের সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘ সময় ধরে তা বিদ্যুৎ খাত, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ ফেলতে পারে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ। বাংলাদেশ যে দামে কয়লার খরচ পরিশোধ করছে, তার ভিত্তি কী? কোন সূচক ব্যবহৃত হচ্ছে? প্রকৃত ক্রয় খরচ কত? পরিবহন খরচ কত? সরবরাহকারীর লভ্যাংশ কত? জ্বালানি খরচের অতিরিক্ত দায় কীভাবে কাজ করছে? এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না করে চুক্তির অর্থনৈতিক সুবিধা বা ক্ষতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। যদি দেখা যায়, সূচক বা মূল্য নির্ধারণের সমীকরণের কারণে বাংলাদেশের পরিশোধ করা মূল্য সরবরাহকারীর প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনার যথেষ্ট কারণ হতে পারে। এখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে একটি স্বাধীন আর্থিক মডেল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখন আসা যাক সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়। গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়িক সুবিধা এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আদানি চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন করা দরকার, বাংলাদেশের ওপর যে আর্থিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি অস্বাভাবিকভাবে লাভবান হয়েছে? এটি প্রমাণিত সত্য হিসেবে বলা যাবে না, তবে তদন্তের প্রয়োজনও অস্বীকার করা যায় না। তাই দেখতে হবে, কারা চুক্তিটি মধ্যস্থতা করেছিলেন, কারা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন এবং কারা অনুমোদন করেছিলেন। কোনো মধ্যস্থতাকারী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক স্বার্থ যুক্ত ছিল কি না, চুক্তির আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে অস্বাভাবিকতা ছিল কি না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো কমিশন, ঘুষ বা অপ্রকাশিত লেনদেন হয়েছিল কি না। এর উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, অর্থের গতিপথে খুঁজতে হবে। ব্যাংকিং নথি, প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা, প্রকৃত মালিকানা, পরামর্শক ফি এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেন আইনগত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু চুক্তির শর্ত সংশোধন যথেষ্ট হবে না; দায়ীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানেই বর্তমান সরকারের বিচক্ষণতা প্রয়োজন। একটি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর মনে হলেই একতরফাভাবে বাতিল করা নিরাপদ নয়। চুক্তি সমাপ্তি ও সালিশি বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য দাবির মুখোমুখি হতে পারে। ফলে একটি খারাপ চুক্তি থেকে বের হতে গিয়ে আরও বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তাই সরকারের কৌশল হওয়া উচিত প্রথমে অডিট, তারপর প্রমাণ সংগ্রহ, এরপর পুনর্দরকষাকষি, সমঝোতা বা বের হয়ে আসা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যাওয়া। প্রথমে সত্য বের করতে হবে, তারপর আইনি ও অর্থনৈতিক অবস্থান শক্ত করে আলোচনায় যেতে হবে।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের উচিত একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক মানের পর্যালোচনা দল গঠন করা। এতে থাকতে পারেন জ্বালানি অর্থনীতিবিদ, আর্থিক অডিটর, আন্তর্জাতিক সালিশি-বিষয়ক আইনজীবী, কয়লা মূল্য নির্ধারণ বিশেষজ্ঞ, বিদ্যুৎ বাজার বিশেষজ্ঞ ও ক্রয় বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কাজ হবে একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করা। বাংলাদেশ কত টাকা দিয়েছে, কত বিদ্যুৎ পেয়েছে, আঞ্চলিক সূচকের তুলনায় শুল্ক কতটা বেশি, সক্ষমতা ব্যয় কত, কয়লার মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি কীভাবে কাজ করেছে, ভবিষ্যতের দায় কত এবং কোনো স্বার্থের সংঘাত বা সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। এই প্রতিবেদনের সংবেদনশীল নয় এমন অংশ জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণ হাতে নিয়ে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে বসতে হবে। প্রথম লক্ষ্য হতে পারে সক্ষমতা ব্যয় পুনর্নির্ধারণ, ন্যূনতম বিদ্যুৎ ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা কমানো, কয়লার মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ করা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শুল্ক সূচক চালু করা এবং বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত বের হয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা পরিবর্তিত হলে বাংলাদেশ যেন অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার জন্য দীর্ঘদিন অর্থ দিতে বাধ্য না হয়।
যদি স্বাধীন পর্যালোচনা দেখায় যে বর্তমান কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য অগ্রহণযোগ্য, তাহলে সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তি শেষ করার পথ বিবেচনা করা যেতে পারে। চুক্তির মেয়াদ কমানো, ভবিষ্যতের বাধ্যবাধকতা কিনে নেওয়া, সক্ষমতা পরিশোধ কমানো অথবা ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ ক্রয় কমানোর মতো বিকল্প থাকতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজনৈতিকভাবে বড় কোনো ঘোষণা নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে কম ক্ষতির সমাধান। সমঝোতা ব্যর্থ হলে তখন আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, দরকার দাপ্তরিক প্রমাণ, আর্থিক প্রমাণ এবং শক্ত আইনি যুক্তি।
আদানির সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধকে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত করা উচিত হবে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিজস্ব গুরুত্ব আছে। বাংলাদেশের অবস্থান হতে পারে খুব পরিষ্কার: ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের অর্থে করা প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি হতে হবে ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই। এটি ভারতবিরোধিতা নয়; এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ন্যায্য বাণিজ্যিক অবস্থান।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, যে রাষ্ট্রের নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা দুর্বল, তার পক্ষে বড় বাণিজ্যিক চুক্তিতে শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন। তাই সরকারকে একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, দ্রুত সম্প্রসারণ করা দরকার। শক্তি সঞ্চয়ের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে এবং দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
কিন্তু উৎপাদনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ দরকার সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে। পুরোনো সঞ্চালন লাইন আধুনিক করতে হবে, উপকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে হবে এবং পদ্ধতিগত ক্ষতি কমাতে হবে। একই সঙ্গে স্মার্ট মিটার ও গ্রিড স্বয়ংক্রিয়করণ বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণের উপযোগী আধুনিক গ্রিড তৈরি করতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই হবে না, সেই বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের ঘরে এবং শিল্পকারখানায় পৌঁছাতে হবে। শক্তিশালী গ্রিড বাংলাদেশকে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে সক্ষম করবে না, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরকষাকষিতেও শক্তিশালী করবে।
তবে শুধু অবকাঠামো যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটিও শক্তিশালী করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, বড় ক্রয়, কৌশলগত অবকাঠামো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দরকার এমন কর্মকর্তা, যাঁরা দক্ষতার পাশাপাশি সততা, সাহস এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার দেখাবেন। এদের বলা যেতে পারে দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের লোক নন; বরং এমন পেশাদার কর্মকর্তা, যাঁরা আইন মেনে সিদ্ধান্ত নেবেন, তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবেন, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক চাপ প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন, বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে প্রয়োজন হলে কঠিন দরকষাকষি করবেন এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ওপরে রাখবেন। তাঁদের একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও দিতে হবে, আবার জবাবদিহির আওতায়ও রাখতে হবে।
আদানি চুক্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে শুধু একটি চুক্তি পর্যালোচনা করলেই হবে না; বাংলাদেশের দরকার একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সরকার একটি জাতীয় কৌশলগত চুক্তি পর্যালোচনা কর্তৃপক্ষ বা অনুরূপ স্বাধীন জাতীয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা গঠন করতে পারে। এই সংস্থা বড় ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় চুক্তি, বিশেষ করে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বন্দর, অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করবে। এখানে থাকতে পারেন খাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক আইন ও সালিশি-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, আর্থিক ও অডিট বিশেষজ্ঞ, ক্রয় বিশেষজ্ঞ, জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলের মনোনীত প্রতিনিধিকেও যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এটি যেন আরেকটি রাজনৈতিক কমিটিতে পরিণত না হয়। সদস্যদের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকতে হবে, স্বার্থের সংঘাতের ঘোষণা বাধ্যতামূলক করতে হবে, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের লিখিত যৌক্তিকতা থাকতে হবে এবং সংসদীয় নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এই কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় স্বার্থ মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি বড় চুক্তির আগে প্রশ্ন করতে হবে, বাংলাদেশ কী পাচ্ছে, মোট ব্যয় কত, ঝুঁকি বণ্টন কার পক্ষে, বিকল্প কী ছিল, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আর্থিক দায় কত, বের হয়ে যাওয়ার খরচ কত, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কত, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে কি না এবং কোনো স্বার্থের সংঘাত আছে কি না। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। চুক্তি হওয়ার পর ক্ষতি গুনে তদন্ত করার চেয়ে চুক্তি হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি নতুন কর্তৃপক্ষ তৈরি করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে ঘোষণা করতে হবে যে কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো দল নয়, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নয়, কোনো বিদেশি শক্তি নয়; বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই হবে চূড়ান্ত বিবেচনা। এই অঙ্গীকার বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা জাতীয় স্বার্থে কঠিন প্রশ্ন তুললে তাঁকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিশোধের ভয় থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আবার কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়ম করলে তাঁকেও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাৎ শক্তিশালী নেতৃত্ব, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, এই তিনটির যৌথ ভূমিকা ছাড়া জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করা কঠিন।
আদানি চুক্তি তাই বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। তারা চাইলে এটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, অথবা এটিকে একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা করতে পারে। সঠিক পথ হবে দ্বিতীয়টি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে, অনিয়মের প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে, ক্ষতিকর শর্ত থাকলে পুনর্দরকষাকষি করতে হবে, প্রয়োজনে সমঝোতার মাধ্যমে বের হয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে এবং আইনি ঝুঁকি থাকলে সালিশি প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি বড় রাষ্ট্রীয় চুক্তির আগে একটি স্বাধীন জাতীয় স্বার্থ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারণ কোনো সরকারই স্থায়ী নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের দায় দীর্ঘস্থায়ী। আজ একজন রাষ্ট্রপ্রধান যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন, তার মাশুল হয়তো পরবর্তী দুই থেকে তিনটি সরকারকে দিতে হবে। তাই বড় চুক্তি কখনো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হতে পারে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, যার ভিত্তি হবে প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই ও জাতীয় স্বার্থ।
আদানি চুক্তির বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বাংলাদেশকে শুধু বিদ্যুৎ কিনতে সক্ষম হলেই চলবে না; বাংলাদেশকে নিজের শর্তে বিদ্যুৎ কিনতে সক্ষম হতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে করা এই চুক্তিতে যদি প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে দায় নির্ধারণ করতে হবে। যদি দুর্নীতি, ঘুষ বা অপ্রকাশিত লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি মূল সমস্যা হয় দুর্বল দরকষাকষি ও অসম ঝুঁকি বণ্টন, তাহলে সেটি সংশোধন করতে হবে আইনি ও বাণিজ্যিক পথেই।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কাজ হবে ভবিষ্যতের জন্য এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো সরকার, কোনো কর্মকর্তা, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠী কিংবা কোনো বিদেশি অংশীদার বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। শক্তিশালী নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেবে, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ যাচাই করবে, বিরোধী দল প্রশ্ন করবে, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ঝুঁকি দেখবে, সংসদ নজরদারি করবে এবং জনগণ জানবে রাষ্ট্র কীসের বিনিময়ে কী অর্জন করছে। এটাই হওয়া উচিত নতুন বাংলাদেশের চুক্তি-নীতির ভিত্তি। কারণ সরকার বদলায়, কিন্তু চুক্তির দায় থেকে যায়। আর সেই দায় যেন আর কখনো কয়েকজনের সিদ্ধান্ত হয়ে পুরো জাতির বোঝা না হয়। সবার আগে বাংলাদেশ।









