সংস্কার: নিষেধের দেয়াল ভেঙেই এগিয়েছে ইসলামপন্থীরা

কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক আন্দোলনই সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, মানুষের প্রয়োজন বদলায়—সঙ্গে সঙ্গে অনেক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক অবস্থানকেও নতুন করে ভাবতে হয়। উপমহাদেশের ইসলামপন্থীদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, তারাও একসময় নানা বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আবার সময়ের ব্যবধানে বাস্তবতার আলোকে সেসব অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এই পরিবর্তনকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার চেয়ে চিন্তার সংস্কার হিসেবে দেখা যায় কি না—সেই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর জেলে থাকাকালীন আমরা সিনিয়রদের কাছে গল্প শুনেছি যে, জামায়াতে ইসলামী একসময় উকিলদের রুকন বানাতো না। কারণ এটি একটি অভিশপ্ত(!) পেশা। এটি সেই পেশা, যেটি দাঁড়িয়ে আছে মিথ্যার সমুদ্রের ওপর!
সময় গড়াল। সময়ের ব্যবধানে দেখা গেল—সেই উকিলরাই জামায়াতের রাজনীতিতে ভাইটাল রোল প্লে করছেন। কেন্দ্র থেকে ইউনিট পর্যন্ত; সকল স্তরের নেতাকর্মীর মুক্তির জন্য সেই উকিলরাই হয়ে উঠলেন ভরসার প্রতীক। এমনকি দলের মার্কা এবং নিবন্ধন ফিরে পেতেও তাঁদের ভূমিকাই ছিল অগ্রগণ্য। অর্থাৎ, যে পেশাকে একসময় এতটা নেতিবাচকভাবে দেখা হয়েছিল, সময়ের বাস্তবতায় সেই পেশার মানুষই হয়ে উঠলেন দলের জন্য অপরিহার্য।
এখানেই প্রশ্নটা আসে—সময় কি তাহলে কিছু ‘নিষেধাজ্ঞা’কে হার মানিয়ে দেয়?
রংপুর জেলে বসে আরও জানতে পারলাম—একসময় জামায়াতে ইসলামী সেই লোকদেরও রুকন বানাতো না, যাদের বাসায় টেলিভিশন আছে। এই তথ্যের সত্য-মিথ্যা জানি না। আশি এবং নব্বইয়ের দশকে যাঁরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাঁরাই বলেছেন। পরবর্তীতে জামায়াত সেই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসে। অর্থাৎ, বাসায় টেলিভিশন থাকলেও রুকন হওয়া যাবে। তবে মিডিয়া বানাতে হবে—এমন চিন্তা মাথায় আসেনি। এটি করতে এগিয়ে এলেন শহীদ মীর কাশেম আলী। তাঁর কন্যা বলেছেন—এজন্য তাঁদের সাংগঠনিকভাবে একঘরে করে ফেলা হয়েছিল। অথচ সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। গণমাধ্যমের শক্তি অস্বীকার করার সুযোগ আর থাকেনি। রাজনীতিতে মানুষের কাছে পৌঁছাতে, নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে, মতাদর্শের প্রচার ও জনমত গঠনে মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে।
একসময় যে টেলিভিশন ছিল রুকন হওয়ার পথে বাধা, পরবর্তীতে সেই বাস্তবতার মধ্যেই গণমাধ্যম হয়ে উঠল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এটিকে কি আমরা শুধু দ্বিচারিতা বলব? নাকি সময়ের সঙ্গে চিন্তার সংস্কার বলব? আমার কাছে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।উপমহাদেশের আলেমসমাজ একসময় ফতোয়া দিলেন—ইংরেজি ভাষা শেখা হারাম। এই সুযোগে হিন্দুরা গেল এগিয়ে। গোটা ভারতবর্ষের নেতৃত্বের আসনে জায়গা করে নিল তারাই। মুসলমানরা হয়ে থাকল চাষা-জেলে।
আলেমগণ বিস্মৃত হলেন—সকল ভাষাই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে।
ইংরেজি ভাষা ছিল শাসকের ভাষা। কিন্তু সেই ভাষাকে অস্বীকার করার অর্থ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ভাষাকে অস্বীকার করা ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিশাল জগত থেকে দূরে সরে যাওয়া।
ফলে যে সমাজ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে গেল, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও এগিয়ে গেল। আর মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়ল। শুধু ইংরেজি না বোঝার কারণে একসাথে ঊনিশ জন মুসলমানকে শহীদ হতে হয়েছিল ঝালকাঠির কুলকাঠিতে; শহীদ ওসমান হাদির এলাকা। ১৯২৭ সালের ঘটনা। এ কারণেই তাঁর বাবা যখন তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি দিলেন, তখন প্রতিশ্রুতি নিলেন—ওসমান হাদি যেন ইংরেজি শিখে মুসলমানদের কাজে লাগেন।
এই ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু শিক্ষা একটি—জ্ঞানকে অস্বীকার করে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। সময়ের বাস্তবতাকে অস্বীকার করেও কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এই লেখার উদ্দেশ্য মিউজিক হালাল কিংবা হারাম হওয়ার ব্যাপারে নিজের কোনো অবস্থান ব্যক্ত করা নয়। এটি একটি এখতেলাফি বিষয়। পৃথিবীর বড় বড় স্কলারদের মধ্যেই মতভেদ আছে এ ব্যাপারে। আমার আলোচনার টপিক ভিন্ন কিছু, মিউজিকের সঙ্গে সম্পৃক্তহীন।
গোটা দুনিয়ার ইসলামিস্টদের কথা জানি না, কিন্তু উপমহাদেশের ইসলামপন্থীদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়—তারা সর্বদা একধরনের চিন্তাগত সংস্কারের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। যুগের বাস্তবতার আলোকে অনেক সিদ্ধান্তকে বরাবরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে প্রবৃত্ত হয়েছে তারা।
এটি কিন্তু এক অর্থে ইতিবাচক দিকই বলতে হবে ইসলামিস্টদের! কারণ একটি আন্দোলন যদি নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়, তাহলে তার সামনে চিন্তার বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে নতুন বাস্তবতা আসে। নতুন প্রশ্ন আসে। নতুন প্রজন্ম আসে। সেই নতুন বাস্তবতার সামনে পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোকে আবার পরীক্ষা করে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে।
এখানে ‘সংস্কার’ শব্দটির গুরুত্ব রয়েছে। সংস্কার মানেই আদর্শ থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং অনেক সময় আদর্শকে সময়ের বাস্তবতায় কার্যকর রাখার জন্যই পদ্ধতি, কৌশল ও চিন্তার সংস্কার প্রয়োজন হয়। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েই যদি বলি—উকিলদের রুকন না বানানোর সিদ্ধান্ত থেকে তাদের সরে আসা, টেলিভিশন থাকা নিয়ে আপত্তির জায়গা থেকে সরে আসা, পরে গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা—এসবই তো একধরনের পরিবর্তনের নজির।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই সংস্কার কি এখানেই শেষ? নাকি সময়ের সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে নিজেদের চিন্তা ও অবস্থানকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ আছে? প্রশ্নটি জামায়াতের জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি উপমহাদেশের অন্যান্য ইসলামপন্থী আন্দোলনের জন্যও প্রযোজ্য।
কারণ পৃথিবী বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা বদলাচ্ছে। মানুষের চিন্তা ও জীবনযাপন বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের প্রশ্নও আগের প্রজন্মের মতো নয়। এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো—কোনটি মূলনীতি, কোনটি সময়নির্ভর সিদ্ধান্ত, কোনটি সাংগঠনিক কৌশল আর কোনটি নিছক অভ্যাস—সেটি আলাদা করে দেখার সক্ষমতা।
ভুল থেকে ফিরে আসা কোনো অপরাধ নয়। বরং ভুল বুঝতে পারা এবং প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার সাহস একটি জীবন্ত চিন্তার লক্ষণ।
ইসলামপন্থীদের ইতিহাসে এই চিন্তাগত সংস্কারের যে ধারাটি আমরা দেখতে পাই, সেটিকে তাই শুধু সমালোচনার চোখে না দেখে ইতিবাচকভাবেও দেখা দরকার।
কারণ সময়ের কাছে হার মানা সব ‘নিষেধাজ্ঞা’ পরাজয়ের গল্প নয়। কখনো কখনো এগুলো আসলে একটি আন্দোলনের শেখার, নিজেকে সংশোধন করার এবং বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপনের গল্প।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা উকিল হারাম কি না, টেলিভিশন হারাম কি না কিংবা মিউজিক হালাল কি না—শুধু সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো—নিজেদের সিদ্ধান্তকেও কি আমরা সময়ের পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারি? যদি পারি, তাহলে সংস্কারের দরজা খোলা থাকে।আর যে আন্দোলন নিজের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে, তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়।
#লাবিব আহসান, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









