হাসিনার ব্যাপারে কি আস্থা হারিয়েছে দিল্লি?

পলাতক মানুষের কথার পিঠে কথা জমে। সেই কথার ওপর ভর করেই ডালপালা মেলে নানান জল্পনা। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়েছেন দুই বছরেরও বেশি সময় হলো। এর আগে তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও আওয়ামী লীগের ভেতরের অনেক নেতাই আড়ালে-আবডালে ভিন্ন কথা বলতেন। তাঁদের দাবি ছিল, সাবেক এই স্বৈরশাসক তীব্র মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। দেশের মাটিতে ফেরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও তাঁর নেই। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে তাঁর অডিও বার্তা আমরা শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে সেই রাজনৈতিক সাহসের কোনো প্রকাশ কখনো দেখা যায়নি। অথচ এবার তিনি হঠাৎ করেই দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরেই নাকি দলের পলাতক নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরবেন এবং স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। হঠাৎ এই দিনক্ষণ ঘোষণা কেন? তাহলে কি ভারত আর তাঁকে দিল্লির নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে আগ্রহী নয়?
একটি পুরোনো রাজনৈতিক প্রবাদ আছে, কলকাতার আকাশে মেঘ জমলে ঢাকার বাতাসও ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু এখন সেই প্রবাদ যেন উল্টো পথে বইতে শুরু করেছে। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে নতুন ভারসাম্য এবং পূর্বমুখী কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীকে প্রভাব বলয়ের বাইরে চলে যেতে দেখছে ভারত। ঠিক এই কারণেই কি দিল্লি এখন শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে? ভারত কি বুঝতে পারছে, বাংলাদেশে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে হলে এই পুরোনো রাজনৈতিক বোঝা আর বহন করা লাভজনক নয়?
এই প্রশ্নগুলোর পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের সাম্প্রতিক মন্তব্য। দিল্লির নিয়মিত ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ ভারত পেয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো ভারতের কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এ ধরনের বক্তব্য দিলেন।
জয়সোয়ালের এই কূটনৈতিক মন্তব্যের ভেতরে বিশ্লেষকেরা দুটি সম্ভাব্য দিক দেখছেন। প্রথমত, শেখ হাসিনার ওপর থেকে হয়তো ভারত ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে। এত বড় রাজনৈতিক বোঝা আর কত দিন বহন করা সম্ভব? দ্বিতীয়ত, অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো দিল্লির নতুন কোনো রাজনৈতিক কৌশল। শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি বা রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। বাস্তবে কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, সেটি সময়ই বলে দেবে।
দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি কঠোর নজরদারির মধ্যেই জীবনযাপন করছেন। ভারত সরকারের অনুমোদন ছাড়া তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসা প্রায় অসম্ভব। এতদিন তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে মূলত লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। এবার আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স দাবি করেছে, তারা টেলিফোনে সরাসরি তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নীরব সম্মতি ছাড়া এমন সাক্ষাৎকার সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এই ফোনালাপ এবং ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে অনেকেই ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর ফ্রান্সের প্রভাবশালী সংবাদপত্র লা মঁদ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, "Sheikh Hasina: India's Burden" অর্থাৎ ভারতের বোঝা শেখ হাসিনা। সময় যত গড়াচ্ছে, ভারতের জন্য সেই বোঝা বহন করা ততই কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রাখার বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে দিল্লি যদি সত্যিই এই রাজনৈতিক দায় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায়, সেটি অস্বাভাবিক কিছু হবে না।
এদিকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা নেই। দলটির কার্যক্রম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের কেউ কারাগারে, কেউ বা ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। দেশের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীরাও প্রায় সম্পূর্ণ অসংগঠিত। মাঝেমধ্যে দু-একটি ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা হলেও দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তা থেমে যাচ্ছে।
এমন এক বৈরী রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন? তিনি তো আর সীমান্ত পেরিয়ে লংমার্চ করে আসতে পারবেন না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই হত্যা মামলা। ফলে সীমান্তে উপস্থিত হলেই লাখো মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাবে—এমন ধারণার বাস্তবভিত্তি নেই।
তবুও এই ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। দলটির অনুগত প্রচারকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁরা কর্মীদের মধ্যে কৃত্রিম আশাবাদ তৈরির চেষ্টা করছেন।
২০০৪ সালের একটি ঘটনার কথা দেশের প্রবীণ মানুষেরা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন। সে সময় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে এক ‘ট্রাম্পকার্ড’-এর হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ৩০ এপ্রিলের পর বিএনপি আর ক্ষমতায় থাকবে না। কিন্তু ৩০ এপ্রিল পার হয়ে গেলেও সেই তথাকথিত ট্রাম্পকার্ডের দেখা মেলেনি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ জনদৃষ্টি নিজেদের দিকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
শেখ হাসিনার এই ডিসেম্বরের ঘোষণাও অনেকটা সেই ধরনের একটি রাজনৈতিক স্টান্ট বলেই মনে হয়। এই ঘোষণায় তাঁর বাস্তবিক কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বরং কেউ কেউ মনে করেন, তিনি দেশের বাইরে থাকুন—সরকারের জন্য সেটিই হয়তো বেশি সুবিধাজনক। কারণ তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে কারাগারেই রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আবারও তাঁর দিকে নিবদ্ধ হবে। অন্যদিকে, যদি তিনি দেশে ফিরতে না পারেন, তাহলে সেটিকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এক ধরনের সহানুভূতি তৈরির চেষ্টা করা হতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচিত সরকার পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে একই অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারতের আশ্রয়ে থাকা পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। তিনি ফ্যাসিবাদের যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এত বড় হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগ বা তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অনুশোচনা কিংবা ক্ষমা প্রার্থনার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং তাঁরা জুলাইয়ের আন্দোলনের যোদ্ধাদের ‘জঙ্গিবাদী’ আখ্যা দিয়ে আবারও রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া রায় বাস্তবায়নই এখন জনগণের প্রধান প্রত্যাশা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা যেহেতু আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলেছেন, তাই ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে তিনি দমন-পীড়নের মূল নকশাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। বিক্ষোভ দমনে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর আকাশ ও স্থলপথ থেকে ড্রোন, হেলিকপ্টার, স্নাইপারসহ মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ তাঁর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেই এসেছে বলে ট্রাইব্যুনাল অভিমত দেন। হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলা, গুম করা এবং অপরাধের তথ্য-প্রমাণ গোপন করার ক্ষেত্রেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততার কথা রায়ে উঠে আসে। আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়ার মতো অমানবিক নির্দেশও তাঁর পক্ষ থেকেই এসেছিল বলে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ দেন।
আইনি প্রক্রিয়ার দিক থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেননি। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রেও বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করে আপিল করার আইনি নজির রয়েছে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন, তাহলে প্রথমে বিলম্ব মার্জনার আবেদন জানিয়ে আপিলের অনুমতি চাইতে পারবেন। আপিল বিভাগেও যদি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তবে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকবে। রিভিউ খারিজ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়াই হবে তাঁর শেষ আইনি পথ। সেটিও নাকচ হলে প্রচলিত জেল কোড অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ও বাংলাদেশের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিয়ে একটি বিস্তৃত তদন্ত পরিচালনা করে। ১১৪ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত দমন-পীড়নের নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন, যাদের একটি বড় অংশই ছিল শিশু ও তরুণ। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনার প্রমাণ তদন্তে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা শুধু আইনি দায়িত্ব নয়, নৈতিক দায়িত্বও। শেখ হাসিনা আজ পর্যন্ত দেশের মানুষের কাছে এসব ঘটনার জন্য প্রকাশ্যে কোনো অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। বরং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে সেই ঘটনার দায় অস্বীকার কিংবা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতাই বেশি দেখা গেছে।
দিল্লির বর্তমান অস্বস্তির আরেকটি কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্রুত পরিবর্তন। জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের একটি অংশ মনে করেছিল, নতুন সরকার গঠনের পর তাদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকেও শুরুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান দেখা গিয়েছিল। নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সফট পাওয়ার নেটওয়ার্কও দলটিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা চালায়। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও পাল্টা বয়ান তৈরির উদ্যোগও চোখে পড়ে।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রশ্নে দেশের তরুণ সমাজ ও ছাত্রসমাজ যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তা ভারতের নীতিনির্ধারকদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ফ্যাসিবাদবিরোধী এক ধরনের শক্ত অবস্থান গড়ে উঠেছে। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি দেখিয়েছে, দেশের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিরোধী। অন্যদিকে বিএনপিও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের যেকোনো উদ্যোগ দেশের জন্য আত্মঘাতী হবে।
এই বাস্তবতায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে জাতীয় সংসদে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চায় সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ফলে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকেও সংগঠন হিসেবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনার পলাতক জীবনের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগের মাত্র তিন দিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, "শেখ হাসিনা পালায় না।" কিন্তু মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। এই ঘটনাই তাঁর সেই ঘোষণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এর আগেও রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁকে দেশের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দেশে থেকেই রাজনীতি চালিয়ে গেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেন। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে ফেরেন। আবার ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও তিনি চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশে যান। সে সময় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেও দেশত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল। কিন্তু তিনি দেশ ছাড়েননি।
সমালোচকদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সমঝোতা, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল এবং কঠোর দমননীতি। দেশের জনগণের চেয়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও বহিরাগত সমর্থনের ওপর তাঁর নির্ভরতা বেশি ছিল বলেও তাঁদের অভিযোগ। এমনকি নিজের দলের নেতাকর্মীদের প্রতিও তাঁর আস্থার ঘাটতির কথা বিভিন্ন সময়ে তাঁর নিজের বক্তব্যেই উঠে এসেছে। একবার সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ছাড়া আওয়ামী লীগের সবাইকে কেনা যায়। আবার নিজের কার্যালয়ের এক পিয়নের বিপুল সম্পদের বিষয়টি প্রকাশ্যে উল্লেখ করেও তিনি আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।
দেশত্যাগের আগে নিজের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন বলেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। শেখ পরিবারের কোনো সদস্যকে দেশে গ্রেপ্তার হতে হয়নি। এসব ঘটনা সমালোচকদের সেই বক্তব্যকেই আরও জোরালো করেছে যে, তাঁর রাজনীতি ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক ছিল; বৃহত্তর দল বা জনগণের ওপর আস্থার ভিত্তিতে নয়।
চব্বিশের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনও এ দেশের মানুষের মনে দগদগে ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার তরুণের পঙ্গুত্বের দায় নিয়ে আওয়ামী লীগ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
সমালোচকদের অভিযোগ, দলটির একটি অংশ অতীতেও দিল্লির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। তাঁদের মতে, দেশের তরুণ প্রজন্ম আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় যদি ভারত ভবিষ্যতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশে উল্টো প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে। ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে, দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই দিল্লির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি। শেখ হাসিনার হঠাৎ করে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা কি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে দিল্লির কৌশলগত সম্মতি? ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য এবং রয়টার্সকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকার—দুটি ঘটনাই প্রায় একই সময়ে সামনে এসেছে। তাই অনেক বিশ্লেষকের কাছেই বিষয়টি নিছক কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না।
অবশ্য এটাও সত্য, ভারতের মতো একটি রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের স্বার্থকে কেন্দ্র করে নয়। ফলে দিল্লি যদি মনে করে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রাখার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যয় লাভের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে, তাহলে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করাটা অস্বাভাবিক হবে না। আবার অন্যদিকে, যদি তারা মনে করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি একটি কার্যকর কূটনৈতিক উপাদান হতে পারে, তাহলে তাঁকে ঘিরে নতুন কোনো রাজনৈতিক হিসাবও তারা কষতে পারে। দুই সম্ভাবনাই আপাতত আলোচনায় রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের ভেতরের বাস্তবতা স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি ভেঙে পড়েছে। নেতৃত্ব ছিন্নভিন্ন। দেশের ভেতরে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর। সবচেয়ে বড় কথা, জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে জনমতের বড় একটি অংশ এখনও তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় কেবল একটি ঘোষণার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হবে—এমনটি মনে করার কোনো বাস্তব কারণ নেই।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন, তাহলে তাঁর সামনে রাজনৈতিক নয়, আইনি বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে। আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ—সবকিছুই তখন বিচার বিভাগের আওতায় পরিচালিত হবে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে আইনের শাসনই মুখ্য হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। জুলাই-আগস্টের ঘটনায় যাঁরা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা হলো একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়া। সেই বিচার যত বেশি আইনের ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সম্পন্ন হবে, ততই তা দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবে।
দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার হঠাৎ সুর পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভারত যদি সত্যিই শেখ হাসিনার ব্যাপারে অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে থাকে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ। আর যদি এটি কেবল বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর, বাইরের কোনো বার্তার ওপর নয়।
দিনশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বক্তৃতা বা ঘোষণায় নয়, বরং আইন, আদালত এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। আর বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সেটিই—জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর বিচার কীভাবে এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়। কারণ ব্যক্তি বা দলের ভবিষ্যতের চেয়ে একটি রাষ্ট্রের জন্য আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।









