জাতীয় ঐক্যের বার্তা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে তো ?

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশ যেন কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। সে জন্য গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে হবে। একই সঙ্গে তিনি চরমপন্থা ও উগ্রবাদকে প্রশ্রয় না দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বিরোধী দলের সহযোগিতা কামনা করেন। উল্লেখ্য, গত ৭ জুন শুরু হওয়া সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ১১ জুন চলতি অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয় এবং ৩০ জুন তা পাস হয়। ২৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শেষ হয় ১৫ জুলাই।
বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি ইঙ্গিতও বটে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক ছিল দা-কুমড়ার মতো মুখোমুখি অবস্থান। অবিশ্বাস, আধিপত্য এবং সংঘাত ছিল যার প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কের জায়গায় ধীরে ধীরে সংলাপ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বীকৃতির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিরোধী দলের পরাজয় মেনে নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ছিল এই পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পালাবদল যেমন স্বাভাবিক, তেমনি পরাজয়কে মেনে নিয়ে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াও একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক। তার প্রতিফলন ইতোমধ্যেই সংসদে দেখা গেছে। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, সমালোচনা, বিতর্ক এবং সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক কর্মসূচি।সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান যেন এই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করার একটি প্রচেষ্টা।
তবে রাজনৈতিক ঐক্য অনেকটা কাঁচের পাত্রের মতো, গড়ে তুলতে সময় লাগে, কিন্তু অসতর্কতায় ভাঙতে সময় লাগে না। তাই এই ঐক্য কতদিন টিকে থাকবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। গত কয়েক মাসে এমন বহু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ককে উত্তপ্ত করে তুলতে পারত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, রাজনৈতিক দোষারোপের সংস্কৃতি, বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বিরোধ এবং নানা ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে ছোট-বড় ফাটল তৈরি করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের তুলনামূলক সংযত ও দায়িত্বশীল অবস্থান সেই ফাটলকে বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে দেয়নি। এটাই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি আশাব্যঞ্জক দিক।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং সেটিই গণতন্ত্রের প্রাণ। প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজস্ব আদর্শ, কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের কাছে যাবে, আর জনগণই তাদের গ্রহণযোগ্যতার বিচার করবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি প্রতিহিংসায় পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সেই স্বাভাবিক পরিবেশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিরোধী দলকে মাঠে দাঁড়ানোর সুযোগ না দেওয়া, নির্বাচনের আগেই ফল নির্ধারণের অভিযোগ, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের গ্রেপ্তার, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল এবং জাল ভোট। এসব ছিল তখনকার নির্বাচনী বাস্তবতার অংশ। ফলে নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের মতামতের উৎসব না হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছ। সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কেও অতীতের তুলনায় ভিন্ন এক পরিবেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা স্থায়ী হবে কি না, তার উত্তর এখনো সময়ের কাছেই রয়ে গেছে। কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেবল নেতৃত্বের বক্তব্যে পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তন আসতে হয় মাঠপর্যায়ের আচরণে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় এবং নির্বাচন পরিচালনার বাস্তব প্রক্রিয়ায়।
সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইতোমধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনেক সময় জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও বেশি সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতীতে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি, হামলা, মারধর, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ।
এই নির্বাচনই নির্ধারণ করে দেবে, জাতীয় ঐক্যের বর্তমান বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর। যদি মাঠপর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, প্রশাসন কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহল আবারও বিরোধীদের প্রতি বৈষম্যমূলক বা দমনমূলক আচরণ করে, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের যে আশা তৈরি হয়েছে, তা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে। তখন কেবল ক্ষমতার চেয়ার বদলাবে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র অপরিবর্তিত থেকে যাবে। অন্যদিকে যদি সব রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পায়, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে এবং জনগণ অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তবে সেটিই হবে নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ঐক্যের প্রকৃত শক্তি ভাষণে নয়, আচরণে। প্রতিশ্রুতিতে নয়, প্রয়োগে। সামনে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনই প্রমাণ করবে, বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই কি সংঘাতের পুরোনো বৃত্ত ভেঙে সহনশীল গণতন্ত্রের নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছে, নাকি নতুন মুখের আড়ালে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আবার ফিরে আসছে।









