জোটহীন ভোটে কতটা প্রস্তুত ‘সাবেক উপদেষ্টা’ আসিফ?
পিরামিডের চূড়া থেকে এবার পতন নয়তো!

স্থানীয় নির্বাচন জোটবদ্ধভাবে হবে না বলে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। খবরটি শোনার পর থেকে কেন জানি সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে। এত অল্প বয়সে রাজনীতির পিরামিডের এত ওপরে উঠে যাওয়া মানুষটির সামনে এখন নামার পালা কি না, সেটাই ভাবছি। এখন কী করবেন তিনি? ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে দাঁড়াবেন? নাকি এমন কোনো নিরাপদ রাজনৈতিক সমীকরণের অপেক্ষায় থাকবেন, যেখানে লড়াইটা হবে কিন্তু হারার ঝুঁকিটা থাকবে না?
যতদূর মনে হচ্ছে, ঢাকা দক্ষিণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে। সেখানে আসিফ মাহমুদের অবস্থান কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অবশ্য রাজনীতিতে প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় বক্তৃতার মঞ্চে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় ভোটকেন্দ্রে। আর ভোটকেন্দ্র এমন এক জায়গা, যেখানে মাইকের আওয়াজ, ফেসবুকের পোস্ট কিংবা মঞ্চের হাততালি কোনো কাজে আসে না।
আসিফ মাহমুদ চব্বিশের বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনার ছিলেন। সেই আন্দোলনের পর খুব অল্প বয়সেই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে আসার বিরল সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে কম বয়সী মন্ত্রীদের (উপদেষ্টা) একজন তিনি। এরপর এনসিপির প্রথম সারির প্রভাবশালী নেতা। দলে তাঁর একটা নিজস্ব প্রভাববলয়ও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুতেই যে উচ্চতা অনেকে পেতে পেতে জীবন পার করে দেন, আসিফ মাহমুদ সেটি পেয়ে গেছেন প্রায় দৌড়ের প্রথম ল্যাপেই।
এখানেই অবশ্য বিপদ।
কারণ রাজনীতির পিরামিডে খুব দ্রুত ওপরে উঠে গেলে একটা অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হয়। নিচের মাটিটা কতটা শক্ত, সেটি বোঝার সুযোগ থাকে না। চারপাশে তখন মানুষ থাকে, অনুসারী থাকে, ক্যামেরা থাকে, মঞ্চ থাকে, স্লোগান থাকে। মনে হতে থাকে, সবই বুঝি নিজের শক্তি। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে গিয়ে বোঝা যায়, কোনটা নিজের শক্তি আর কোনটা পরিস্থিতির তৈরি ঢেউ।
জাতীয় নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি নানা কারণে। সেটি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাঁর জন্য মানানসই জায়গা হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা অনেকের মাথায় আসতেই পারে। ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, পরিচিত মুখ, বিপ্লবের ফ্রন্টলাইন ইমেজ এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাঁর জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার জায়গা হতে পারত।
কিন্তু সমস্যা হলো, সেই পরীক্ষায় যদি জোট না থাকে!
জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাড়া নির্বাচন করলে কতটা লজ্জায় পড়তে হতে পারে, সেটা আসিফ মাহমুদের চেয়ে ভালো আর কে জানেন! কারণ তিনি তো রাজনীতির সাম্প্রতিক হিসাব-নিকাশের একেবারে ভেতরের মানুষ। তিনি জানেন, কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। কে বক্তৃতায় কতটা বড়, আর ভোটের মাঠে কতটা ছোট, সেটিও তাঁর অজানা থাকার কথা নয়।
এনসিপির এখনও তেমন কোনো গ্রাউন্ড তৈরি হয়নি দেশের কোথাও। রাজধানীর বাইরে দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি কতটা গভীর, সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর ঢাকা দক্ষিণ তো দূরের কথা! সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের মতো পুরোনো সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হলে শুধু বিপ্লবের উত্তরাধিকার দিয়ে ভোটের বাক্স ভরানো কঠিন।
দলের কোনো কোনো নেতা অবশ্য যতই বাগাড়ম্বর করুন না কেন, আসিফ মাহমুদ নিশ্চয়ই বাস্তবতা জানেন। রাজনীতিতে বক্তৃতা দিয়ে বাস্তবতা ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু ভোটের ফলাফল দিয়ে তা ঢেকে রাখা যায় না। তিনি তো জানেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন না করে এককভাবে করলে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারত!
সুতরাং এখন তাঁর সামনে বেশ মজার এক রাজনৈতিক ধাঁধা। একদিকে তিনি এনসিপির প্রথম সারির নেতা। অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও তাঁর রাজনৈতিক উচ্চতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অর্থাৎ পিরামিডের চূড়ায় তিনি যতটা দৃশ্যমান, সেই পিরামিডের ভিত্তি ততটা দৃশ্যমান নয়।
আর এটাই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট।
জীবনের প্রারম্ভেই পিরামিডের চূড়ায় উঠে যাওয়ার একটা আলাদা সমস্যা আছে। তখন প্রতিটি পরবর্তী পদক্ষেপ আগের উচ্চতার সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়। আরও ওপরে উঠতে না পারলে মনে হয় পিছিয়ে যাচ্ছেন। আর একবার নিচে নামলে সেটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক যাত্রা হিসেবে না দেখে অনেকে পতন হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
আসিফ মাহমুদও হয়তো প্রতিনিয়ত সেই চিন্তার মধ্যেই আছেন। কারণ রাজনীতিতে শুধু ওঠার গল্প থাকলে হয় না, টিকে থাকার গল্পও লিখতে হয়। বিপ্লবের সময় সামনে থাকা আর নির্বাচনের সময় মানুষের ভোট পাওয়া এক জিনিস নয়। প্রথমটি ইতিহাসের অংশ হতে পারে, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
এরই মধ্যে তাঁর একসময়ের কলিগ মাহফুজ আলম অনেকটাই হারিয়ে গেছেন আলোচনা থেকে। একসময় যাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল, এখন তাঁর নাম-গন্ধও খুব একটা শোনা যায় না। রাজনীতি বড় নির্মম জায়গা। আজ যিনি আলোচনার কেন্দ্রে, কাল তাঁর জায়গায় অন্য কেউ। আজ যাঁকে ঘিরে ভবিষ্যতের গল্প লেখা হচ্ছে, কাল তাঁকেই হয়তো ফুটনোটে খুঁজতে হবে।
এই বাস্তবতাটা আসিফ মাহমুদের নিশ্চয়ই অজানা নয়।
কবিতার এই কথাগুলো রাজনীতির ক্ষেত্রেও বেশ নির্মমভাবে সত্যি। রাজনীতিতে কেউ চিরকাল শীর্ষে থাকে না। জনপ্রিয়তার গ্রাফও সবসময় ওপরে ওঠে না। বিশেষ করে যাঁরা খুব অল্প সময়ে অনেকটা ওপরে উঠে যান, তাঁদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো সেই উচ্চতাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
আসিফ মাহমুদের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।
তিনি ঢাকা দক্ষিণে দাঁড়াবেন কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দাঁড়ালে কত ভোট পাবেন, সেটিও এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। নির্বাচন কতটা ফেয়ার হবে, সেটিও সময়ই বলবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, এনসিপির জন্য অপেক্ষা করছে অগ্নিপরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষায় আসিফ মাহমুদের জন্য প্রশ্নটি আরও ব্যক্তিগত: চব্বিশের বিপ্লব তাঁকে যে উচ্চতায় তুলে দিয়েছে, ভোটের রাজনীতি কি তাঁকে সেই উচ্চতায় টিকিয়ে রাখবে?
নাকি পিরামিডের চূড়া থেকে এবার সত্যিই নামার পালা?
(লাবিব আহসানের লেখাটি ঈষৎ সংযোজিত)









