গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই; বিল আছে ঠিকই!

দুই মাস ধরে বাসার গ্যাসের লাইনে গ্যাস নেই। তবু সুনাগরিকের মতো নিয়ম করে গ্যাসের কার্ড রিচার্জ করে যাচ্ছি। গ্যাস নেই, কিন্তু বিল আছে। নাগরিকের দায়িত্ব পালনে কোনো বিরতি নেই। একপর্যায়ে গ্যাসের অপেক্ষা ছেড়ে টাকা খরচ করে একটি ইলেকট্রিক চুলা কিনলাম। মনে হলো _গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ তো আছে! রান্নাঘরে বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেললেই হলো। চুলা কিনে বাসায় ফিরলাম। তারপর দেখা গেল, বিদ্যুৎও নেই।
ঘটনাটি শুনতে হয়তো হাস্যকর। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এর মধ্যে হাসির চেয়ে হতাশাই বেশি। কারণ আমার রান্নাঘরের এই ছোট্ট সমস্যাটি আসলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বড় সংকটের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। একটি সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, তাই নাগরিক নিজের পয়সায় বিকল্প ব্যবস্থা করছে। সেই বিকল্প ব্যবহার করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় সেবাটিও নির্ভরযোগ্য নয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি নেই।
এখানেই বিষয়টি আর ব্যক্তিগত অসুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রশ্নটা চলে যায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের দিকে। নাগরিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছে, নিয়মিত বিলও দিচ্ছে। বিনিময়ে সে চায় নির্ভরযোগ্য সেবা। কিন্তু সেই সেবা না পেয়ে যখন নিজের টাকায় বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে, তখন খরচটা হচ্ছে দুবার—একবার রাষ্ট্রীয় সেবার জন্য, আরেকবার সেই সেবা না পাওয়ার ক্ষতি পোষাতে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ঘাটতির বোঝাটাও শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই নিজের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে।
রান্নাঘরের সমস্যার শুরু রান্নাঘরে নয়
বাসার চুলায় গ্যাস নেই —এই সমস্যাটিকে যদি শুধু ‘গ্যাসের সংকট’ হিসেবে দেখি, তাহলে আসল চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে আছে দেশের গ্যাস উৎপাদন, দেশীয় অনুসন্ধানে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা, আমদানিনির্ভরতা, এলএনজি সরবরাহ, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ এবং পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রশ্ন। অর্থাৎ রান্নাঘরের আগুন আসলে জ্বালানি নীতির সঙ্গেই যুক্ত।
গ্যাসের ঘাটতি যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলে, তখন সংকটটি আরও বড় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; কোনো কোনো দিনে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য এসেছে। একই সময়ে ১৪৩টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি সংকটে পড়েছিল। এর মধ্যে ২৬টি ছিল গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট শুধু বাসার চুলা নিভিয়ে দেয় না, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাকেও অকার্যকর করে দিতে পারে।
এখানে আমার ইলেকট্রিক চুলা কেনার ঘটনাটিও যেন রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবস্থার একটি ছোট সংস্করণ। গ্যাস নেই, তাই বিদ্যুতের দিকে গেলাম। বিদ্যুৎ নেই, তাই সেই বিকল্পও কাজে লাগল না। নাগরিকের কাছে বিষয়টি হয়তো একটি চুলা থেকে আরেক চুলায় যাওয়ার গল্প। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটি জ্বালানি পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতার প্রতীক—একটি ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করতে যে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে, সেটি আদৌ কতটা প্রস্তুত, নির্ভরযোগ্য এবং টেকসই—সেই প্রশ্নটি আগে থেকেই করা হয়নি।
নাগরিকের বিকল্প আছে, রাষ্ট্রের বিকল্প কোথায়?
গ্যাস না থাকলে একজন সামর্থ্যবান নাগরিক ইলেকট্রিক চুলা কিনতে পারেন। বিদ্যুৎ না থাকলে আইপিএস, ব্যাটারি বা জেনারেটর কিনতে পারেন। আবার কেউ চাইলে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি পূরণে বাজারে কিছু ব্যক্তিগত বিকল্প আছে। কিন্তু এসব বিকল্পের প্রতিটিই নাগরিকের জন্য বাড়তি খরচ।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় সেবার বিকল্প হওয়া উচিত নয়। একজন নাগরিক গ্যাসের সংযোগ নিয়ে নিয়মিত বিল দিচ্ছেন। বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েও নিয়মিত বিল দিচ্ছেন। এরপর গ্যাস না থাকলে ইলেকট্রিক চুলা, বিদ্যুৎ না থাকলে আইপিএস কিংবা জেনারেটর কিনতে হচ্ছে। তাহলে রাষ্ট্রীয় সেবার জন্য যে অর্থ তিনি দিয়েছেন, তার বিনিময়ে তিনি ঠিক কী পেলেন?
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সবার পক্ষে সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষমতা এক নয়। গ্যাস না থাকলে সামর্থ্যবান পরিবার ইলেকট্রিক চুলা বা এলপিজি কিনতে পারে, বিদ্যুৎ না থাকলে আইপিএস কিংবা জেনারেটরের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু নিম্নআয়ের একটি পরিবারের কাছে এসবই বাড়তি, অনেক সময় অসম্ভব খরচ। মাসের আয় যেখানে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা আর চিকিৎসার খরচ মেটাতেই ফুরিয়ে যায়, সেখানে গ্যাসের বিকল্প চুলা বা বিদ্যুতের বিকল্প আইপিএস কেনার টাকা কোথা থেকে আসবে?
ফলে একই সংকট সবার জীবনে একইভাবে আঘাত করে না। যার সামর্থ্য আছে, সে টাকা খরচ করে সংকট থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে পারে; আর দরিদ্র পরিবারকে অনেক সময় সেবার সংকটের সঙ্গেই বসবাস করতে হয়। গ্যাস নেই—তাই বিকল্প জ্বালানি কেনার সামর্থ্য নেই, বিদ্যুৎ নেই—তাই আইপিএস বা জেনারেটরের প্রশ্নই ওঠে না। রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি তখন তাদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে আসে।
একজন সচ্ছল মানুষ সংকট সামাল দিতে যে টাকা খরচ করেন, সেটি হয়তো তার জন্য বাড়তি ব্যয়। কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষের জন্য একই খরচ মানে অন্য কোনো প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেওয়া, ধার করা কিংবা কোনো প্রয়োজন মুলতবি রাখা। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সেবার দুর্বলতার মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হয় তাদেরই, যাদের সেই মাশুল দেওয়ার সামর্থ্য সবচেয়ে কম।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল নাগরিকের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করা। কিন্তু সেবা না দিয়ে যদি রাষ্ট্র মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প কিনে নিতে বাধ্য করে, তাহলে সেই ব্যবস্থায় ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যার টাকা আছে, সে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নিজের পকেট দিয়ে কিছুটা সুরক্ষা কিনতে পারে; যার টাকা নেই, তার জন্য রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই হয়ে ওঠে দৈনন্দিন বাস্তবতা।
একই সেবার জন্য দুবার টাকা
আমাদের জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকগুলোর একটি হলো এই ‘দ্বৈত খরচ’। নাগরিক প্রথমে রাষ্ট্রীয় সেবার জন্য অর্থ দেন। এরপর সেবা না পেয়ে সেই সেবার বিকল্প কিনতেও অর্থ দেন। গ্যাসের বিল দেওয়ার পর ইলেকট্রিক চুলা কেনা, বিদ্যুতের বিল দেওয়ার পর আইপিএস কেনা—এগুলো নিছক ব্যক্তিগত খরচ নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতির কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ব্যয়।
এর সঙ্গে যোগ হয় সময়ের মূল্য, কাজের ক্ষতি এবং মানসিক চাপ। বিদ্যুৎ কখন আসবে জানা নেই, গ্যাস কখন আসবে জানা নেই—তাই রান্না, ব্যবসা, অফিস, কারখানা, দোকান—সবকিছুর পরিকল্পনাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একটি নির্ভরযোগ্য সেবা না থাকলে নাগরিককে শুধু টাকা নয়, নিজের সময় এবং জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতাও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তিনি চান, যে সেবার জন্য তিনি অর্থ দিচ্ছেন, সেটি নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যাক। তিনি চান না, প্রতিটি সংকটের সময় তাকে নিজের পকেট থেকে রাষ্ট্রের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রীয় সেবা যদি নাগরিককেই ব্যক্তিগত অর্থে কিনে নিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্বের জায়গাটি কোথায় থাকে?
চুলার বাইরে সংকটের আরেকটি চেহারা
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটকে শুধু বাসাবাড়ির দুর্ভোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। শিল্প খাতে এর প্রভাব আরও গভীর। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একটি দেশের শিল্প উৎপাদন যখন জ্বালানির অনিশ্চয়তায় আটকে যায়, তখন তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বাজারের ওপরই পড়ে।
কারখানায় উৎপাদন কমলে পণ্যের সরবরাহ কমে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ব্যবসার সক্ষমতা কমে এবং কর্মসংস্থানেও চাপ তৈরি হয়। উদ্যোক্তা অতিরিক্ত খরচের একটি অংশ পণ্যের দামে যোগ করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের মাশুল দেন ভোক্তাই। অর্থাৎ আমার বাসার চুলা না জ্বলার সঙ্গে একটি কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে; আর সেই কারখানার উৎপাদন কমার সঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ারও সম্পর্ক আছে।
এ কারণেই জ্বালানি সংকটকে কোনোভাবেই কেবল ‘গ্যাস নেই’ বা ‘বিদ্যুৎ কম’ ধরনের দৈনন্দিন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হলে শিল্প দুর্বল হয়, শিল্প দুর্বল হলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে চাপ পড়ে, উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে। একটি রান্নাঘরের চুলা থেকে শুরু হওয়া সমস্যা এভাবেই জাতীয় অর্থনীতির বড় সংকটে রূপ নেয়।
সক্ষমতা আছে, কিন্তু সেবা কোথায়?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় প্রশ্ন হলো—আমাদের সক্ষমতা ও বাস্তব সরবরাহের মধ্যে এত ফারাক কেন? বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বছরের পর বছর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট, আর্থিক সংকট, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা ও নানা ধরনের ব্যবস্থাপনার সমস্যায় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। আবার চলতি অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলেও হিসাব এসেছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে একদিকে বিপুল অর্থের দায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ না পাওয়ার অভিযোগ—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
এখানে প্রশ্নটি তাই শুধু ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে কি না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তার সুফল নাগরিকের ঘরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না। রাষ্ট্র যদি সক্ষমতা তৈরিতে অর্থ ব্যয় করে, কিন্তু সেই সক্ষমতা নাগরিকের নির্ভরযোগ্য সেবায় রূপান্তর করতে না পারে, তাহলে পরিকল্পনার সাফল্য পরিমাপ হবে কী দিয়ে?
গ্যাসের জন্য বিপুল অর্থ, তবু অনিশ্চয়তা
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে তথ্য এসেছে। আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৭ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনাও ছিল। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও যদি গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—সমস্যাটি কোথায়? আরও আমদানি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো, মজুত সক্ষমতা, পাইপলাইন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনাকে একসঙ্গে দেখতে হবে?
জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত দাম দেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জরুরি এলএনজি কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি কার্গোতে অন্তত ১৬৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য এসেছে। সংকটের মুহূর্তে জরুরি ক্রয় প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কি সব সময় সংকট তৈরি হওয়ার পর বেশি দামে সমাধান কিনবে, নাকি সংকটের আগেই এমন ব্যবস্থা করবে যাতে নাগরিক ও অর্থনীতিকে বারবার জরুরি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে না হয়?
সংকটের বিল শুধু বিদ্যুৎ বিলে আসে না
আমরা সাধারণত বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিলকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা হিসেবে দেখি। কিন্তু সেবার অনিশ্চয়তার প্রকৃত বিল আরও বড়। বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসার উৎপাদন কমে, জেনারেটর চালাতে ডিজেল লাগে, আইপিএসের ব্যাটারি কিনতে হয়। গ্যাস না থাকলে বিকল্প জ্বালানি কিনতে হয়। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে ব্যবসার ক্ষতি হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় একটি অংশ কখনো আলাদা করে ‘জ্বালানি সংকটের বিল’ নামে নাগরিকের হাতে আসে না। কিন্তু সেটি নাগরিকই দেন—বাজারে বেশি দাম দিয়ে, কর দিয়ে, ব্যবসার ক্ষতি বহন করে কিংবা নিজের ঘরে বিকল্প ব্যবস্থা কিনে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই এসে পড়ে।
তাই নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার আছে—রাষ্ট্রীয় সেবার জন্য যে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতার কোনো সম্পর্ক থাকবে না? নাগরিক কি শুধু বিল দেওয়ার সময় রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান, কিন্তু সেবা পাওয়ার সময় অদৃশ্য?
রাষ্ট্র যদি প্রতিটি সংকটের সমাধান নাগরিকের হাতে তুলে দেয়
একটি রাষ্ট্রের কাজ হলো নাগরিককে এমন একটি নির্ভরযোগ্য সেবা ব্যবস্থা দেওয়া, যেখানে প্রতিটি মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আলাদা আলাদা বিকল্প তৈরি করতে হবে না। গ্যাস নেই—নিজের চুলা কিনুন। বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস কিনুন। তাও না হলে জেনারেটর কিনুন। এই মডেল কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের টেকসই সেবা ব্যবস্থা হতে পারে না।
কারণ নাগরিকের কাজ রাষ্ট্রের ঘাটতি পূরণ করা নয়। নাগরিক কর দেবেন, বিল দেবেন, আইন মানবেন এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অধিকার ভোগ করবেন। রাষ্ট্রের কাজ হবে সেই সেবা নিশ্চিত করা। কোনো কারণে সেবা ব্যাহত হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের বিকল্প পরিকল্পনা থাকতে হবে। একটি জ্বালানি উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস কীভাবে কাজ করবে, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা হলে মজুত কতদিন চলবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস কমলে বিকল্প জ্বালানি কোথা থেকে আসবে, শিল্প ও সাধারণ মানুষের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সংকট শুরু হওয়ার আগেই প্রস্তুত থাকার কথা।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই
জ্বালানি খাত কোনো এক বছরের বাজেট বা একটি সরকারের মেয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়। গ্যাস অনুসন্ধান থেকে এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সঞ্চালন ও বিতরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে স্টোরেজ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। কোথায় কত চাহিদা বাড়বে, শিল্প কোথায় যাবে, নগরায়ণ কীভাবে বাড়বে, কোন জ্বালানির ওপর কতটা নির্ভরতা রাখা নিরাপদ—এসব হিসাব করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় সংকট মোকাবিলাই প্রধান পরিকল্পনা হয়ে দাঁড়ায়। গ্যাস কমেছে—জরুরি আমদানি। বিদ্যুৎ কমেছে—জরুরি জ্বালানি। সরবরাহে সমস্যা—জরুরি ক্রয়। এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেক সংকট এসে হাজির হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে আমরা ক্রমেই তাৎক্ষণিক সমাধানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।
একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এমন হতে পারে না যে, সংকট দেখা দিলেই সরকারকে বাজারে ছুটতে হবে আর নাগরিককে নিজের ঘরে বিকল্প কিনতে হবে। রাষ্ট্রের পরিকল্পনা যদি সংকটের আগে তৈরি না থাকে, তাহলে সংকটের সময় তার মূল্য দিতে হয় কয়েক গুণ বেশি। আর সেই মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থেই পরিশোধ হয়।
সরকার বদলায়, নাগরিকের সংকট কেন থেকে যায়?
এই প্রশ্নে এসে রাজনৈতিক দায়ের বিষয়টিও সামনে আসে। জ্বালানি সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এক সরকারের আমলে এর শুরু, আরেক সরকারের আমলে এর বিস্তার—এভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতায় যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রের দায় একই থাকে।
সরকার বদলাবে, নীতি বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবেন, কর্মকর্তারাও বদলাবেন। কিন্তু জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং জবাবদিহির কাঠামো যদি বদলাতে না পারে, তাহলে সংকটের চরিত্রও বদলাবে না। তাই কোনো একটি সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে পুরো সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে ‘আগের সরকারের সমস্যা’ বলে পাশ কাটিয়েও যাওয়ার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায় হলো—নাগরিককে এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে না ফেলা, যেখানে সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই কিন্তু সেবার মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আছে। নাগরিকের কাছে সরকার পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগামীকাল সকালে তার চুলায় আগুন জ্বলবে কি না এবং রাতে ঘরে বিদ্যুৎ থাকবে কি না।
সুনাগরিকের দায়িত্বে কিন্তু কোনো লোডশেডিং নেই
শেষ পর্যন্ত আবার আমার সেই বাসার রান্নাঘরে ফিরে আসি। দুই মাস ধরে গ্যাস নেই। তবু গ্যাসের কার্ড রিচার্জ করছি। রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার জন্য নিয়ম মেনে অর্থ দিচ্ছি। গ্যাস না থাকায় নিজের টাকা খরচ করে ইলেকট্রিক চুলা কিনলাম। তারপর দেখলাম, বিদ্যুৎও নেই।
তবু মাস শেষে বিল আসবে। গ্যাসের বিল আসবে, বিদ্যুতের বিল আসবে। নাগরিকের দায়িত্ব পালনে কোনো লোডশেডিং নেই। কার্ড রিচার্জে কোনো সংকট নেই। বিল তৈরিতে কোনো জ্বালানি ঘাটতি নেই। বিল পৌঁছানোর ব্যবস্থায় কোনো সঞ্চালন সমস্যা নেই। শুধু যে সেবার বিনিময়ে বিল—সেই সেবাটুকুতেই যেন বারবার সংকট।
এটাই সম্ভবত আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ। সেবার সরবরাহে ঘাটতি আছে, কিন্তু বিলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। নাগরিকের দায়িত্বে কোনো লোডশেডিং নেই; লোডশেডিং যেন শুধু নাগরিকের প্রাপ্য সেবাতেই।
আসল প্রশ্ন চুলা নিয়ে নয়
আমার সমস্যাটি আসলে একটি চুলা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী আশা করতে পারেন এবং রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে কী দাবি করতে পারে? রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কাছ থেকে নিয়মিত বিল, কর ও নানা ধরনের ফি আদায় করে, তাহলে নাগরিকও স্বাভাবিকভাবেই নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত সেবা প্রত্যাশা করতে পারেন।
রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, সংকট থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে, জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নয়। আর সংকটের সব দায় নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে বলা যায় না—‘বিকল্প ব্যবস্থা করে নিন।’
কারণ নাগরিকের পকেট সীমাহীন নয়। প্রতিটি বিকল্পেরও একটি মূল্য আছে। আজ গ্যাস নেই বলে চুলা কিনলাম, কাল বিদ্যুৎ নেই বলে আইপিএস কিনলাম, পরশু জ্বালানি নেই বলে আরেকটি ব্যবস্থা করলাম—এভাবে একটি দেশের নাগরিক কতবার রাষ্ট্রের ব্যর্থতার খরচ বহন করবেন? আমি যদি সেবার দাম নিয়মিত দিই, তাহলে রাষ্ট্র কি সেবা দেওয়ার দায়িত্বটাও নিয়মিত পালন করবে না? কারণ নাগরিকের বিলের সরবরাহে যখন কোনো ঘাটতি নেই, তখন নাগরিকের প্রাপ্য সেবার সরবরাহে এত ঘাটতি কেন?









