হরমুজকে ‘অস্ত্র’ করে কতটা সুবিধা করতে পারছে ইরান?
অবরোধে কার লাভ, কার ক্ষতি

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-জলপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অথচ যে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হয়েছিল, বৈশ্বিক তেলের বাজার এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ২০ আগস্ট ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৩-৯৪ ডলারের আশপাশে ছিল—অবশ্যই যুদ্ধের আগে তুলনায় বেশি, কিন্তু ১২০-১৫০ ডলারের সেই ভয়াবহ স্তরে নয়, যে মাত্রার আশঙ্কা শুরুতে তৈরি হয়েছিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো—হরমুজকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে ইরান আসলে কতটা সুবিধা করতে পারছে? বিশ্বকে জ্বালানি-নিরাপত্তার সংকটে ফেলার যে কৌশল তেহরান নিয়েছিল, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত ইরানের অর্থনীতির ওপর উল্টো চাপ তৈরি করছে? আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, আপাতত চিত্রটি সেদিকেই যাচ্ছে।
হরমুজের গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য যেত। ফলে এটি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের বড় ধরনের ধাক্কা আসার কথা। মার্চে হরমুজের সংকট তীব্র হওয়ার সময় ব্রেন্টের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠেছিল; এপ্রিলের শেষেও একপর্যায়ে তা ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু বাজার পরে নিজেকে কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। এটাই ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
ইরান হরমুজকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারও বসে থাকেনি। সৌদি আরব তার পূর্বাঞ্চলের তেলকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়ার জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বা পেট্রোলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই পথে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন তেল সরবরাহের সক্ষমতা কাজে লাগানোর কথা সৌদি আরব জানিয়েছিল। পাইপলাইনটির মোট সক্ষমতা আরও বেশি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও রয়েছে হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ। আবুধাবি থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত এডিসিওপি পাইপলাইন সরাসরি হরমুজের বাইরে গিয়ে তেল পৌঁছে দিতে পারে। এর সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন।
অর্থাৎ হরমুজের বিকল্প কোনো পথ নেই -এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বিকল্প পথ সীমিত, ব্যয়বহুল এবং সক্ষমতায় কম; কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত নয়। আর এই পার্থক্যটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ইরানের হিসাব ছিল, হরমুজে চাপ তৈরি হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এতটাই সংকুচিত হবে যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বিস্ফোরিত হবে। তখন তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, মিত্ররা ওয়াশিংটনের যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত তেহরান দর-কষাকষিতে শক্ত অবস্থানে যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা এখন পর্যন্ত সেই হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রও এই সংকট থেকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে মার্কিন তেলের চাহিদা বেড়েছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি রেকর্ড ৫৬ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
অর্থাৎ যে সংকট ইরান বৈশ্বিক বাজারে তৈরি করতে চেয়েছিল, তার একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের তেলশিল্পের জন্য নতুন বাজারও তৈরি করেছে।
এখানেই অর্থনৈতিক যুদ্ধের আসল বৈপরীত্য।
ইরান হরমুজ বন্ধ করে বিশ্বকে ব্যথা দিতে চাইছে। কিন্তু সেই ব্যথা থেকে যুক্তরাষ্ট্রও কিছু সুবিধা আদায় করছে। বিপরীতে ইরানের নিজের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, বিক্রির জন্য বড় মূল্যছাড় দিতে হচ্ছে এবং ক্রেতাদের সংখ্যা সীমিত হয়ে আসছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তার তেলের বাজারের বিকল্প খুব কম।
চীন এখনো ইরানি তেলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা, পরিবহনঝুঁকি এবং হরমুজের অনিশ্চয়তার কারণে সেই বাণিজ্যও আগের মতো নেই। ছায়া-বহরের মাধ্যমে তেল সরানো, মালয়েশিয়ার উপকূলের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর এবং বড় ধরনের মূল্যছাড়—এসব কৌশল ইরানকে কিছু তেল বিক্রির সুযোগ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আগের মতো আয় নিশ্চিত করছে না।
কারণ শুধু তেল বিক্রি করলেই হয় না। প্রশ্ন হলো—কত দামে বিক্রি করা যাচ্ছে, কতটা তেল বিক্রি করা যাচ্ছে এবং সেই তেল বাজারে পৌঁছাতে কত খরচ হচ্ছে। এখানেই ইরানের ‘নেটব্যাক’ বা প্রকৃত প্রাপ্তি কমে যাচ্ছে।একদিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে হরমুজ সংকট—দুটি চাপ একসঙ্গে ইরানের ওপর কাজ করছে।
আর এর প্রভাব শুধু তেল খাতেই সীমাবদ্ধ নেই।
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি ও কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে। যুদ্ধ ও নতুন অর্থনৈতিক অবরোধ সেই দুর্বলতাগুলোকে আরও তীব্র করেছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে, রিয়াল দুর্বল হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
অর্থাৎ হরমুজের সংকট ইরানের জন্য শুধু ভূরাজনৈতিক অস্ত্র নয়; এটি এখন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপেরও উৎস। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের তেল বিক্রি কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীনসহ ইরানের সম্ভাব্য ক্রেতাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক লেনদেনে বাধা এবং সমুদ্রপথে নজরদারি—সব মিলিয়ে ইরানের তেল আয়ের পথ সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে এখানেও একটি বড় ঝুঁকি আছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে যে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চেপে ধরলেই দ্রুত আত্মসমর্পণ করানো যাবে, সেটিও ভুল হিসাব হতে পারে। ইরান এমন একটি রাষ্ট্র, যে দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা তৈরি করেছে। ছায়া-বহর, মধ্যস্বত্বভোগী, বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সীমান্তপথের বাণিজ্য এবং চীনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক—এসবের মাধ্যমে তেহরান চাপ সামলানোর চেষ্টা করবে।
তাই ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে মানেই ইরান দ্রুত সমঝোতায় বসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং তেহরানের সামনে এখন আরেকটি পথ খোলা আছে—যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা।
হরমুজকে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে না দেওয়া, জাহাজ চলাচলে ভয় তৈরি করা, লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতা অব্যাহত রাখা, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে ব্যয়বহুল করে তোলা—এসবই ইরানের সম্ভাব্য কৌশলের অংশ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অভ্যন্তরীণ দমননীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষা।
তেহরান হয়তো ভাবতে পারে—আজকের আমেরিকা আগামী দিনের আমেরিকা নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই এখনই সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার বদলে আরও কিছু সময় চাপ সহ্য করাই হয়তো তাদের কাছে যুক্তিসংগত মনে হতে পারে। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। সময় ইরানের পক্ষে যেমন কাজ করতে পারে, তেমনি বিপক্ষেও যেতে পারে।
কারণ দীর্ঘস্থায়ী হরমুজ সংকট শুধু আমেরিকা বা ইউরোপকে চাপ দিচ্ছে না; এশিয়ার তেল আমদানিকারকদেরও চাপ দিচ্ছে। ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। তেল পরিবহন, জাহাজভাড়া ও বীমার ব্যয় বাড়ছে। পরিশোধিত জ্বালানি—বিশেষ করে ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি—সরবরাহে চাপ তৈরি হলে এর প্রভাব আরও দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ ইরানের কৌশল যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিশ্বকে ব্যথা দেবে ঠিকই। কিন্তু সেই ব্যথার একটি বড় অংশ ইরানের ওপরও ফিরে আসবে।
এ কারণেই হরমুজের অস্ত্রকে ‘বুমেরাং’ বলার যুক্তি তৈরি হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রও নিরাপদ নয়। আমেরিকান ভোক্তাদের উচ্চ পেট্রোলের দাম দিতে হচ্ছে। সামরিক অভিযান, নৌবহর মোতায়েন, জাহাজের নিরাপত্তা এবং বিমান হামলার খরচ বাড়ছে। কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকেও তেল ছাড়তে হচ্ছে। ১৪ আগস্টের পরিসংখ্যানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত প্রায় ২৯৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ তেলের বাজারে একটি সংকট সামলাতে কয়েক মাস কৌশলগত মজুত ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল নয়। বৈশ্বিক মজুত কমতে থাকলে এবং শীতকালীন চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। তখন আজকের ৯৩-৯৪ ডলারের তেল ভবিষ্যতে আর এতটা স্বস্তিদায়ক মনে নাও হতে পারে। এখানেই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
পবিকল্প পাইপলাইন, অতিরিক্ত মার্কিন রপ্তানি, মজুত থেকে তেল সরবরাহ এবং এশিয়ার চাহিদা ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে বাজার এখনো টিকে আছে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই স্থায়ী সমাধান নয়।
হরমুজের বিকল্প পাইপলাইনগুলোর সক্ষমতা সীমিত। মার্কিন তেল উৎপাদন ও রপ্তানিও সীমাহীন নয়। কৌশলগত মজুতও অনন্ত নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ববাজারে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল প্রয়োজন, তা কয়েকটি বিকল্প রুট দিয়ে অনির্দিষ্টকাল পূরণ করা সম্ভব নয়।
তাই আগামী দুই থেকে তিন মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির ভার ইরানের ওপরই বেশি। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল আয়ের পথ সংকুচিত করতে পারছে, আবার নিজস্ব তেল উৎপাদন ও রপ্তানি থেকে অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে। এই হিসাবে ওয়াশিংটনের হাত এখনো শক্তিশালী।
কিন্তু সময় যত যাবে, হিসাব তত জটিল হবে।
বিশ্বের তেল মজুত কমতে থাকবে। জ্বালানির দাম বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়বে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। শীতকালীন চাহিদা যুক্ত হবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও চাপ অনুভব করবেন, ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতিতেও চাপ বাড়বে।
আর তখন ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি বনাম পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব আর এত একপেশে থাকবে না। এটাই ইরানের শেষ ভরসা হতে পারে।
তেহরান হয়তো জানে, হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ রাখলে নিজের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এটাও জানে, দীর্ঘস্থায়ী সংকট যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ইরানের কৌশল এখন সরাসরি জয় পাওয়ার নয়; বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। এই জায়গায় এসে যুদ্ধটি আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান বা নৌবহরের লড়াই থাকে না। এটি হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধ—কে আগে ক্লান্ত হবে, কে আগে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে, আর কে বেশি সময় ধরে নিজের অর্থনীতি সচল রাখতে পারবে।
এই যুদ্ধে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। কিন্তু খেলাটি শেষ হয়নি। ইরানের হরমুজ-লিভারেজ আগের মতো শক্তিশালী নেই—এটি সত্য। কিন্তু একে পুরোপুরি অকার্যকরও বলা যাবে না। হরমুজের অস্থিতিশীলতা এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০ আগস্ট ব্রেন্টের দাম প্রায় ৯৪ ডলারে পৌঁছানোও দেখাচ্ছে, বাজার সংকটকে উপেক্ষা করছে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও জানে, হরমুজ দীর্ঘদিন অচল থাকলে তেলের দাম, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামরিক ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত তার নিজের অর্থনীতিতেও আঘাত করবে।
তাই বর্তমান ভারসাম্যটি আসলে খুবই ভঙ্গুর।ইরান এখনো হরমুজকে নিজের প্রধান দর-কষাকষির অস্ত্র হিসেবে ধরে রাখতে চাইবে।যুক্তরাষ্ট্রও চাইবে এই অস্ত্রকে যতটা সম্ভব নিষ্ক্রিয় রেখে ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে। মাঝখানে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপ এবং বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো—যাদের ওপর এই সংঘাতের অর্থনৈতিক মাশুল ক্রমেই বাড়ছে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘হরমুজ খুলবে কি না’—এত সরল নয়।
প্রশ্ন হলো, হরমুজের এই অবরোধে আসলে কে কতদিন টিকে থাকতে পারবে? ইরান কি নিজের অর্থনৈতিক ক্ষতি সহ্য করে হরমুজকে দর-কষাকষির অস্ত্র হিসেবে ধরে রাখবে? নাকি বৈশ্বিক বাজারের বিকল্প ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি তেল সরবরাহ এবং ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপের নীতি শেষ পর্যন্ত তেহরানকে সমঝোতার পথে ঠেলে দেবে? আর যদি সংকট শরৎ পেরিয়ে শীত পর্যন্ত গড়ায়, তখন কি আজকের ৯৩-৯৪ ডলারের তেল আর থাকবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে- হরমুজকে বন্ধ করে বিশ্বকে চাপে ফেলার কৌশল ইরানকে কিছুটা কৌশলগত ক্ষমতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই অস্ত্রের ধার তার নিজের অর্থনীতিকেও কাটছে।
হরমুজ ইরানের হাতের অস্ত্র। কিন্তু সেই অস্ত্রটি এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার ঝুঁকিতেও রয়েছে। আর এই মুহূর্তে অবরোধের অর্থনৈতিক পাল্লা—অন্তত স্বল্পমেয়াদে—ইরানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ভারী।
পুনশ্চ: ইসরায়েল ১৭-১৮ আগস্ট রাতে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে আটটি বিমান হামলা চালিয়েছে। বিমানঘাঁটিটি তুরস্ক সীমান্ত থেকে মাত্র ৪৩ মাইল দূরে। হামলায় রানওয়ে ও সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের বাইরে ইসরায়েলের এই তৎপরতা আঞ্চলিক সংঘাতের আরেকটি নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দিতে পারে। এ নিয়ে আগামীকাল বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।









