মুকুটহীন এক সংসদীয় অভিভাবকের বিদায়

জাতীয় সংসদের স্পিকারের আসনটি কেবল একটি সাংবিধানিক পদ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সংসদীয় গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই আসনে যিনি বসেন, তাঁর নিরপেক্ষতা ও সংযমের ওপর নির্ভর করে গোটা হাউসের মর্যাদা। দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এমনই এক দীপ্তিমান, বিনয়ী এবং সর্বজনশ্রদ্বেয় অভিভাবক ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। ৯৫ বছর বয়সে তাঁর চিরবিদায় কেবল একটি বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান নয়, বরং এ দেশের সুস্থ ধারার সংসদীয় রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত তেঁতুলিয়া থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরবর্তীতে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা শেষ করা এই মানুষটি আজীবন লালন করেছেন অনন্য এক পরিশীলিত সৌজন্যবোধ। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁকে কেবল রাজনৈতিক সহকর্মীই ভাবতেন না, বরং পারিবারিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পিতৃসুলভ স্নেহের এক পরম মেন্টর বা অভিভাবক হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঠিকই মনে করিয়ে দিয়েছেন—জমির উদ্দিন সরকারের সেই ট্রেডমার্ক থ্রি-পিস স্যুট, মাথায় হ্যাট আর হাতে ছাতা যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর মার্জিত ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক আভিজাত্যের চিরচেনা রূপক।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পরিক্রমায় তিনি দেশের বিভিন্ন আসন থেকে মোট ছয়বার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদে প্রথম পা রাখার পর থেকে এই দীর্ঘ আইনপ্রণেতার যাত্রা এ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপরেখা গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি কেবল একজন সাধারণ সদস্য ছিলেন না; বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির ওপর অগাধ পাণ্ডিত্যের সাহায্যে আমাদের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বিতর্ক-তর্কের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখা এবং সংসদীয় রীতিনীতির চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
জমির উদ্দিন সরকারের সংসদীয় জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন। সংসদ পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন। হাউসের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রয়াত এই স্পিকারের বিনয়, উদারতা ও অমায়িক ব্যবহারের কথা স্মরণ করে বলেন, তাঁর দীর্ঘ জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কখনো কারও কোনো অভিযোগ তিনি শোনেননি।
আইন পেশা ও রাজনীতির জটিল সমীকরণেও তাঁর ব্যক্তিগত সততা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক চমৎকার দিক উঠে আসে জাতীয় সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের একটি স্মৃতিচারণায়। এক কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আদালতে নিপীড়িত রাজনৈতিক সহকর্মীদের পক্ষে বারবার দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ পেশাদারি ফি পরিশোধ করতে গেলে তিনি তা বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “একসাথে রাজনীতি করেছি, তাদের জীবনের এই কঠিন চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে আমার মধ্যে সামান্য মানবতা থাকলে ফি নেওয়া সম্ভব নয়।” তাঁর এই উচ্চকিত মানবিকতা ও নীতিবোধ বর্তমান সময়ের বৈরী ও বস্তুবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিরল দৃষ্টান্ত।
তিনি শুধু একজন সফল স্পিকার কিংবা আইনজীবীই ছিলেন না, বরং একাধারে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, বহু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং একজন দূরদর্শী লেখকও ছিলেন। ১৯৯৬ সালের স্বল্পকালীন সরকারে আইনমন্ত্রী হিসেবে ঐতিহাসিক ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল’ প্রণয়নে তাঁর বিশেষ অবদান এ দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক স্মরণীয় বাঁক। বিদায়ের ক্ষণে সংসদ ভবনের যে লাল ইটের দেয়ালগুলোর নিচে আজ তাঁর স্মরণে শোকপ্রস্তাব উঠছে, সেই সংসদ ভবনের অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ কিন্তু একদিন তাঁরই হাত ধরে সম্পন্ন হয়েছিল। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিশীলিত ও সংযত রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে উদাহরণ রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য পাঠশালা হিসেবে বেঁচে থাকবে।









