গণঅভ্যুত্থানের পর কেউ কি সত্যিই ফিরে আসে?
রেজা পাহলভি থেকে শেখ হাসিনা

ইরানের নির্বাসিত 'যুবরাজ' রেজা পাহলভি গত চার দশকে বহুবার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি দেশে ফিরবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। ১৯৮৬ সালে গোপন বেতার সম্প্রচারের মাধ্যমে দেওয়া এক ভাষণে তিনি প্রথমবারের মতো বলেছিলেন, "আমি ফিরে আসব।" অর্থাৎ, পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই দেশে ফিরে নেতৃত্ব নেবেন—এমনই ছিল তাঁর বার্তা। এরপর কত শতবার তিনি একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
সবশেষ গত জানুয়ারিতে ইরানে বিক্ষোভ চলাকালে তিনি আবারও বলেন, "আমি আসছি, আপনারা শুধু রাজপথ দখলে রাখুন।" তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, আন্দোলনকারীরা রাজপথ ধরে রাখলেই তিনি দেশে ফিরে পরিস্থিতির নেতৃত্ব নেবেন।
এই দৃশ্যটি আমাদের জন্যও একেবারে অপরিচিত নয়। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালানো এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সাম্প্রতিক সময়ে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে সেই প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত বারবার উঠে এসেছে। ফলে রেজা পাহলভির দীর্ঘদিনের 'আমি ফিরছি' ঘোষণার সঙ্গে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার একটি স্বাভাবিক তুলনা সামনে চলে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হল—গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া কোনো শাসক কি সত্যিই আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারেন?
যে যাই বলুক, রেজা পাহলভির প্রতি ইরানে সামান্য হলেও জনসমর্থন রয়েছে। রাজতন্ত্রপন্থী একটি অংশ তাঁকে এখনো ভবিষ্যতের বিকল্প হিসেবে দেখে। আমাদের দেশের অনেক সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষকও প্রায়ই সেই সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। এটাও সত্য যে, বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি ইরানের জনগণের বড় একটি অংশের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে আছে।
কিন্তু এই অসন্তোষের অর্থ এই নয় যে, জনগণ রেজা পাহলভিকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। এই জায়গাটিই অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা আবেগের বশে গুলিয়ে ফেলা হয়।
বরং বাস্তবতা হলো, ইরানে যখনই কোনো আন্দোলন, গণবিক্ষোভ বা রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, তখনই রেজা পাহলভি ধরে নেন জনগণ যেন তাঁকেই ডাকছে। এরপর শুরু হয় তাঁর চিরচেনা ঘোষণা—"আমি আসছি।" গত ৪০ বছর ধরে এই একই দৃশ্য বারবার দেখা গেছে। আন্দোলন হয়েছে, মানুষ রাজপথে নেমেছে, সরকার চাপে পড়েছে, আর পাহলভি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আর ফেরা হয়নি।
আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কোনো শাসক আর কখনো আগের মতো ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। তবে অনেকগুলো 'যদি' ও 'কিন্তু' মিলিয়ে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ অবশ্য আছে। তিনি হলেন আর্জেন্টিনার 'আধা স্বৈরাচার' হুয়ান দোমিঙ্গো পেরন।
১৯৫৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে চলা গণবিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ফলে পেরনকে নির্বাসনে যেতে হয়। পেরনকে 'আধা স্বৈরাচার' বলারও কারণ আছে। তিনি সংসদ, সংবিধান, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর কার্যত পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই তাঁর প্রভাবাধীন ছিল। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি করতেন না। কারণ, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কার্যকর কোনো রাজনৈতিক শক্তিই তখন অবশিষ্ট ছিল না। বিরোধীদের অনেককে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল, আবার অনেকে নিজেরাই জনসমর্থন হারিয়েছিলেন।
পেরন এবং তাঁর স্ত্রী ইভা পেরন নিজেদেরকে প্রায় ঈশ্বরপ্রদত্ত নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তাঁদের ব্যক্তিপূজাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহ দেওয়া হতো। এমনকি পেরনের জীবনীও শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু যেসব সামরিক জেনারেল তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, ক্ষমতায় বসার পর তারাই পূর্ণাঙ্গ স্বৈরাচারে পরিণত হয়। তখন সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে পেরনের আমলকে তুলনামূলক ভালো বলতে শুরু করে। সামরিক সরকারের কুশাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকটে জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একই সময়ে পেরনের অনুসারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। ফলে নির্বাসনে থাকলেও তাঁর জনপ্রিয়তা আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে।
অবশেষে ১৯৭৩ সালে পেরন নিজ দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ী হয়ে আবার প্রেসিডেন্ট হন। তবে সেই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র নয় মাসের মাথায় তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার আগে দীর্ঘদিন নির্যাতিত, পরীক্ষিত ও ত্যাগী অনুসারীদের বাদ দিয়ে তিনি নিজের স্ত্রী ইসাবেল পেরনকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে আবারও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী আবার অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে।
আধুনিক বিশ্বের আরেকটি আলোচিত উদাহরণ ফিলিপাইন। ১৯৮৬ সালে গণবিক্ষোভের মুখে স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস দেশ ছেড়ে তাঁর বিলাসী স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসকে নিয়ে হাওয়াইয়ে আশ্রয় নেন। জীবদ্দশায় তিনি আর কোনোদিন দেশে ফিরতে পারেননি।
মার্কোস সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের পেছনে তাঁর স্ত্রীর বিলাসবহুল জীবনযাপনও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার জোড়া জুতা, বিপুল সম্পদ ও সীমাহীন ভোগবিলাস জনগণের কাছে স্বৈরশাসনের প্রতীক হয়ে ওঠে। ভোট কারচুপির চেয়েও মার্কোসের বড় নেশা ছিল দুর্নীতি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা বা নির্মূল করা। তবে বাবা-মা দেশে ফিরতে না পারলেও তাঁদের ছেলে ফার্দিনান্দ 'বংবং' মার্কোস কয়েক বছর পর দেশে ফেরেন। এরপর প্রায় ৩০ বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেন। নির্বাচনে অংশ নেন, পরাজিতও হন, আবার জয়ও পান। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন।
তবে বংবং মার্কোস তাঁর বাবার পথ অনুসরণ করেননি। অন্তত এখন পর্যন্ত তিনি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফিলিপাইনের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তি জীবনে মাত্র একবার, ছয় বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। ফলে বংবং মার্কোসকেও ২০২৮ সালে সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
অর্থাৎ, আধুনিক বিশ্বে গণবিক্ষোভ বা গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় ফেরার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বলতে কার্যত এই দুটি ঘটনাই সামনে আসে। একটি ক্ষেত্রে একজন 'আধা স্বৈরাচার' দীর্ঘ নির্বাসনের পর নিজেই ফিরে এসে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসেছেন। অন্য ক্ষেত্রে একজন স্বৈরশাসকের ছেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, প্রায় ৩৬ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছেছেন।
এর বাইরে গত দুই শতকের ইতিহাসে যত স্বৈরাচার গণঅভ্যুত্থান, গণবিক্ষোভ বা জনরোষের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৯৯ শতাংশই শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করেছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁদের অনেকেই রেজা পাহলভির মতো বলে গেছেন। আজ ফিরব, কাল ফিরব, আগামী মাসে ফিরব, ডিসেম্বরে ফিরব। কিন্তু সেই ফেরা আর বাস্তবে ঘটেনি।
ইতিহাসের শিক্ষা এখানেই। কোনো সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ থাকলেই জনগণ যে অতীতের কোনো ক্ষমতাচ্যুত শাসক বা তাঁর উত্তরসূরিকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়, এমন ধারণার পক্ষে ইতিহাস খুব বেশি সাক্ষ্য দেয় না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ নতুন বিকল্প খোঁজে। আর সেই কারণেই নির্বাসনে থাকা অনেক নেতার "আমি ফিরছি" ঘোষণা বছরের পর বছর ধরে শিরোনাম হলেও, শেষ পর্যন্ত তা ইতিহাসের পাতায় অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যায়।
লেখক: রাজীব আহাম্মদ, গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









