যুদ্ধে জয়ী কি তবে তেহরানই?
ইরান-আমেরিকা সমঝোতা

আমেরিকার সঙ্গে সই হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো যে তথ্য প্রকাশ করছে, তা যদি সত্য হয়, তাহলে এই যুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে ইরানকেই দেখতে হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ইতি টানতে একটি সমঝোতা স্মারকে ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের আলোচনা চলবে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৬০ দিনের আলোচনার সময়েই ইরানের জব্দ থাকা ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ধাপে ধাপে ছাড় করবে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি আলোচনা শুরুর আগেই ইরানকে ১২ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে।
এটি যদি বাস্তবে ঘটে, তাহলে যুদ্ধের আগে যে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার পরিকল্পনা ছিল, সেই কৌশল অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হবে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল ও জ্বালানি বিক্রির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে ভয় পায়। ফলে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। এখন আলোচনার সময় যদি এসব নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়, তাহলে সেটি হবে তেহরানের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো দেবে বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে মিত্র বলতে মূলত ধনী আরব দেশগুলোকে বোঝানো হচ্ছে। কারণ ইরানের অভিযোগ, এসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করেই তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
বিনিময়ে ইরান এসব দেশের ওপর আর হামলা চালাবে না—এমন সমঝোতার কথাও বলা হচ্ছে। আর যদি বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে যায়, তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায়—যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় আরব দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াল, ক্ষতিও হলো; এখন সেই ক্ষতির পুনর্গঠনের খরচও তাদেরই বহন করতে হবে। যদিও এই অর্থ অনুদান নয়, বরং ঋণ হিসেবে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
চতুর্থত, চুক্তি হলে ইরানের সীমান্ত ও আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
পঞ্চমত, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা থাকবে—এমন দাবিও করা হচ্ছে।
ষষ্ঠত, ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি মেনে চলবে। সপ্তমত, লেবাননসহ ইরানের মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও এই সমঝোতার আওতায় আসবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
যুদ্ধে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় ইরানের অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। কিন্তু শুধু সরকার টিকে থাকা নয়, একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে যাওয়াটাকেও ইরানের বিজয় হিসেবে দেখা যেতে পারে।
কারণ খামেনিকে হত্যার পর, মার্চের প্রথম সপ্তাহে অনেকের ধারণা ছিল—ইরানও হয়তো আরব প্রতিবেশীদের মতো শুধু বক্তব্য দেবে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। অনেকেই মনে করেছিলেন, তেহরানের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান দুই লক্ষ্য ছিল—ইরানের সরকার ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। যুদ্ধ শেষে যদি এই দুই লক্ষ্যই অপূর্ণ থাকে, তাহলে তাদের সরাসরি বিজয়ী বলার সুযোগ সীমিত।
বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে ইরান টিকে থাকতে পারলে, সেটিকে তেহরানের কৌশলগত সাফল্য হিসেবেই দেখতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে?
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এই শর্তেই ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করবে এবং বিনিময়ে দেশটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন এবং নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সেখান থেকেই নতুন সংকটের শুরু।
এখন যদি নতুন কোনো চুক্তি হয়, যেখানে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ কাজে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করতে পারবে—তাহলে কার্যত সেটি ২০১৫ সালের চুক্তির কাছাকাছি ফিরে যাওয়া হবে।
যে চুক্তির সবচেয়ে বড় বিরোধিতা করেছিলেন ট্রাম্প নিজেই।
২০১৫ সালের চুক্তির বিরোধিতা করেছিল ইসরায়েলও। এবারও তারা এমন কোনো সমঝোতার পক্ষে নেই। ফলে চুক্তি হলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান ও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে ইরান যদি এবার তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে কোনো চুক্তির আওতায় আনতে পারে, সেটিও কম বড় অর্জন নয়।
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরাজিত হতে পারেন ইরানের সাবেক রাজপরিবারের উত্তরসূরি রেজা পাহলভী। তিনি বরাবরই আশা করে এসেছেন, ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে আবারও রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। ইরানে যখনই সংকট তৈরি হয়, তখনই তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সেই প্রত্যাশার মধ্যেই কেটে গেছে প্রায় ৪৭ বছর।
শেষ পর্যন্ত যদি এই সমঝোতা চুক্তিতে রূপ নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—যে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের পতনের কথা বলা হয়েছিল, সেই যুদ্ধে বাস্তবে কে জয়ী হলো?
ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে হয়তো ইরান সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা, প্রতিপক্ষের মূল লক্ষ্য ব্যর্থ করা এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা—এই তিনটি বিষয় বিবেচনা করলে বিজয়ের পাল্লা তেহরানের দিকেই ভারী হতে পারে।
লেখক: রাজিব আহাম্মদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









