বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষের আগুন ছড়ানোর দায় কার?
শুভেন্দুর ‘পুশইন’ অস্ত্র

রক্তাক্ত কাঁটাতার আর নিঝুম সীমান্তের ওপারে এখন এক অদ্ভুত আঁধার। এমনিতেই অস্থির এই সীমান্তে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এক ভয়াবহ আতঙ্ক—মানুষ ঠেলে দেওয়ার খেলা, যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হচ্ছে ‘পুশইন’। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যেন বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে শুরু হয়েছে এক অলিখিত চাপ ও উসকানির রাজনীতি। আন্তর্জাতিক আইন, ন্যূনতম কূটনৈতিক শিষ্টাচার কিংবা সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের তোয়াক্কা না করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যেই বাংলাদেশে পুশইনের হুমকি দিয়েছিলেন। সেই হুমকি এখন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে রাতের আঁধারে, কখনো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এবার পরিস্থিতি অতীতের মতো নয়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষও। রাত জেগে লাঠি হাতে পাহারায় শামিল হয়েছেন অনেকেই।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নয়াদিল্লিতে একাধিক কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং সীমান্তে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এই উসকানিমূলক আচরণ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভারতের ওপরও পড়বে।
কুড়িগ্রামের রৌমারী, পঞ্চগড়ের মশালগাঁও কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর—সবখানেই এখন সীমান্তবাসীর রাত কাটছে উদ্বেগে। কয়েক দিন আগে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে যা ঘটেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নারী ও শিশুসহ ১০ জন মানুষকে বিএসএফ কাঁটাতারের গেট খুলে বাংলাদেশের জিরো লাইনে এনে রেখে যায়। বিজিবির বাধার কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে টানা ৭০ ঘণ্টারও বেশি সময় খোলা আকাশের নিচে, রোদ-বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাতে হয়েছে তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএসএফ সীমান্তের আলোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে রাতের আঁধারে এসব মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এই দৃশ্য দেখে সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষও আর নীরব থাকতে পারেননি। আবু বক্কর সিদ্দিকদের মতো অনেকেই বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত পাহারায় অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর বিএসএফ ওই ১০ জনকে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। একইভাবে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে আটকে থাকা আরও ১১ জনকেও পরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, নীলফামারী, নেত্রকোনা ও মেহেরপুরসহ অন্তত ৩৬টি সীমান্ত পয়েন্টে শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিজিবির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন হলো, সীমান্তজুড়ে এই অস্থিরতার পেছনে কী কাজ করছে?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর পেছনে রয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংক রাজনীতি এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি তাদের বহুল আলোচিত ‘থ্রি-ডি’ নীতি—ডিটেক্ট, ডিপোর্ট এবং ডিলিট—বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কথিত অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে এবং আরও অনেকে হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছে।
সমস্যা হলো, এই রাজনীতি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতার নতুন মাত্রা তৈরি করছে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর উত্তর ২৪ পরগনা ও মালদা অঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বেড়েছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করছে।
ভারতের মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) অভিযোগ করেছে, বিএসএফ অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদেরও সীমান্তে এনে ফেলে দিচ্ছে, যা শুধু অমানবিকই নয়, ভারতের নিজস্ব সাংবিধানিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সীমান্তে যখন এই উত্তেজনা চলছে, ঠিক তখনই নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার দিনব্যাপী ওই সম্মেলনে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী পুশইন ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পরিষ্কার—আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী কোনো পুশইন মেনে নেওয়া হবে না।
কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে পুশইনের বিষয়টি প্রাধান্যই পায়নি। বরং বাংলাদেশ থেকে অপরাধীদের অনুপ্রবেশ কিংবা সীমান্ত বেড়া কাটার মতো পুরোনো অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। এতে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
একদিকে দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, তিস্তার পানি বণ্টন কিংবা গঙ্গা চুক্তি নবায়নের কথা বলছে, অন্যদিকে সীমান্তে একতরফা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, এটি আসন্ন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখার একটি পদ্ধতি হতে পারে।
ভারতের এই একতরফা পুশইন নীতি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের লঙ্ঘন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করা যায় না। একই সঙ্গে ভাষা, ধর্ম বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সমষ্টিগত বহিষ্কারও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নিষিদ্ধ।
ভারত যদি দাবি করে যে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই একমাত্র বৈধ পথ। অর্থাৎ প্রমাণ উপস্থাপন, কনস্যুলার যাচাই এবং দুই দেশের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু সেই দীর্ঘ আইনি পথ এড়িয়ে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একাধিক কূটনৈতিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ উভয়েই স্পষ্ট করেছেন যে, পরিচয় যাচাই ছাড়া কোনো পুশইন গ্রহণ করা হবে না। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলায় বিজিবির সঙ্গে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে শুধু চিঠি চালাচালি বা সীমান্ত পাহারা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অতীতের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালেও ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে পরিচয় যাচাইয়ের পর ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দায় এড়ানোর প্রবণতাও।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ দেখছে, একদিকে বন্ধুত্বের ভাষণ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তে ঘটছে উল্টো চিত্র। ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে আস্থার ভিত্তি বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ভারতকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কোনো করুণার রাষ্ট্র নয়। এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক শক্তির ব্যবধান থাকলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও আইনের শাসন। প্রতিবেশীকে চাপে রেখে দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্রই লাভবান হয় না।
বাংলাদেশেরও উচিত কেবল সীমান্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি তুলে ধরা। প্রতিটি পুশইন প্রচেষ্টার তথ্য, ছবি, ভিডিও ও স্থানাঙ্ক সংরক্ষণ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
ভারত যদি মনে করে, পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চাপে রেখে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করা সম্ভব হবে, তবে সেটি হবে এক বড় ভুল হিসাব। কারণ এমন নীতি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যকার বিশ্বাসের ভিত্তিকে ক্ষয় করবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে উগ্র রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পথেই ফিরে আসা ভারতের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হবে।









