‘ককরোচ পার্টি’: ভারতের তরুণদের ক্ষোভের নতুন রাজনৈতিক ভাষা

স্রেফ সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল ‘আরশোলা (ককরোচ) পার্টি’। শুরুতে অনেকেই এটিকে সাময়িক অনলাইন ট্রেন্ড কিংবা তরুণদের ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আজ ইনস্টাগ্রামে এই প্ল্যাটফর্মের অনুসারীর সংখ্যা ভারতের যেকোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের চেয়েও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে এটিকে আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কোনো প্রতিবাদী উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বর্তমান ভারত সরকারের প্রতি তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতীকে রূপ দিতে পেরেছে এই ‘আরশোলা’ আন্দোলন। তারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল আজ রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরে। দলটির ডাকে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
ইতিহাস বারবার একটি বিষয় আমাদের সামনে তুলে ধরেছে—শাসকেরা প্রায়ই তারুণ্যের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হন। নতুন প্রজন্মের অসন্তোষকে গুরুত্ব না দিয়ে শুরুতে সেটিকে অবজ্ঞা কিংবা অপপ্রচারের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এখানেও যেন সেই পুরোনো চিত্রেরই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।
আন্দোলনের সূচনালগ্নে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ‘পাকিস্তানি’, ‘জঙ্গি’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তরুণদের অনড় অবস্থান এবং আন্দোলনের বিস্তার সেই প্রচলিত কৌশলকে কার্যকর হতে দেয়নি। বরং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আজকের সমাবেশে সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। অনেকের মতে, এটিই প্রমাণ করে যে আন্দোলনটিকে আর উপেক্ষা করার অবস্থানে নেই ক্ষমতাসীনরা।
আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন আরশোলা পার্টির অন্যতম মুখপাত্র অভিজিৎ। তাঁর উপস্থিতি আন্দোলনটির প্রতি প্রবাসী ভারতীয়দের আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এর আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত গণমাধ্যমকে ঘিরে। এত বড় জনসমাগম ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি কর্মসূচি সত্ত্বেও ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের বড় অংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের ভাষায়, তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’ এই সমাবেশকে কার্যত ব্ল্যাকআউট করে রেখেছে।
দেশটির জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই এই আন্দোলনকে খুব সীমিত পরিসরে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোথাও সংক্ষিপ্ত সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, কোথাও আবার বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে। বাংলা ভাষার প্রভাবশালী সংবাদপত্র থেকে শুরু করে জাতীয় টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেখা যায়নি। কেবল কিছু বামপন্থী ধারা-সমর্থিত এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ের গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের এই নীরবতা ডিজিটাল জগতকে থামাতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরশোলা পার্টির সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক এবং উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভিডিও, ছবি, লাইভ সম্প্রচার এবং নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
আরশোলা পার্টির উত্থানকে কেবল একটি অনলাইন ট্রেন্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এর বিস্তারের পেছনে রয়েছে ভারতের দীর্ঘদিনের কিছু বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বিলম্ব এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই আন্দোলনটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আন্দোলনের নেতারা শুরু থেকেই নিজেদের ‘যুবসমাজের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ দীপকের দাবি, ২০২৬ সালের মে মাসে যাত্রা শুরুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে সেই সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি অতিক্রম করে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিস্ফোরক উত্থান ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কারণ ডিজিটাল যুগে জনমত গঠন ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল একটি মাধ্যম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি রাজনৈতিক শক্তির পরিমাপক হয়ে উঠছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনটি প্রথমে ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতিবাদী একটি ডিজিটাল উদ্যোগ হিসেবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেটি রাজনৈতিক সংগঠনের বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে শুরু করেছে। দিল্লির যন্তর-মন্তরের সমাবেশ ছিল সেই রূপান্তরের প্রথম বড় পরীক্ষা। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছেন।
আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রতীকী ভাষা। ‘আরশোলা’ শব্দটি মূলত একটি অপমানসূচক অভিধাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরের প্রচেষ্টা। ইতিহাসে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশে সামাজিক আন্দোলন প্রায়ই অবমাননাকর অভিধাকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে তাকে প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ দিয়েছে। আরশোলা পার্টিও সেই কৌশল অনুসরণ করছে। ফলে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং ভারতের একাংশ তরুণের সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে।
তবে আন্দোলনটির সামনে বড় প্রশ্নও রয়েছে। কোটি কোটি অনুসারী থাকা আর নির্বাচনী রাজনীতিতে বাস্তব প্রভাব তৈরি করা এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা মাঠের সংগঠন, আদর্শিক কাঠামো, নেতৃত্বের স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির বিকল্প হতে পারে না। ইতিহাসে এমন বহু আন্দোলনের উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো ডিজিটাল জগতে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে।
ভারতের রাজনীতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আরশোলা পার্টি আদৌ একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে কি না, সেটিও সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশটির তরুণ সমাজের একটি অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক এবং নতুন প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে।
সেই বাস্তবতায় আরশোলা পার্টিকে নিছক একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ট্রেন্ড হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ হয়তো আর নেই। যে গতিতে এই জোয়ার বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে আগামী দিনে এই ‘আরশোলারা’ ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য একটি বড় এবং অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটি বিষয়ই শেখায়—ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং সেই নতুন প্রজন্ম, যারা নিজেদের ভাষায়, নিজেদের প্রতীকে এবং নিজেদের ক্ষোভকে সংগঠিত করার পথ খুঁজে পায়। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আরশোলা পার্টি’ হয়তো সেই সম্ভাবনারই সর্বশেষ প্রকাশ।
লেখক: সানাউল হক সানী, সিনিয়র রিপোর্টার (অনুসন্ধান), কালবেলা।









