এক মাসে ঢাকায় ২৪ খুন, ৫৬ ধর্ষণ; নেপথ্যে মাদক-পরকীয়া-জুয়া
সামাজিক অবক্ষয়ের মাশুল দিচ্ছে দেশ

দেশে সামাজিক অবক্ষয় ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়কে কেন্দ্র করে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অপহরণ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধের ধরন শুধু বদলাচ্ছে না, এর নৃশংসতাও বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা এখন ভয়ংকর অপরাধে রূপ নিচ্ছে। শুধু গত মার্চ মাসেই ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় ২৪টি হত্যাকাণ্ড, ৫৬টি ধর্ষণ, ৫৫টি নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ২০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবণতা কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক সংকটেরও বড় বার্তা দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মার্চ মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মোট এক হাজার ৩০৫টি মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক অপরাধ এখন তাৎক্ষণিক উত্তেজনা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের কারণে সংঘটিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে অপরাধ করছে, আবার কিছু ঘটনায় তাৎক্ষণিক রাগ বা হতাশা থেকেও ভয়াবহ সহিংসতা ঘটছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নৃশংসতার মাত্রা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গত ৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ একটি ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক পোশাক শ্রমিকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর একদিন পর ৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
একই দিনে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় পথচারী ১১ বছর বয়সী শিশু রেশমি চোখে গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকন শিশুটিকে অপহরণ করে হত্যা করে। পরে তার বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
একই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন সন্তান মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং রসুল মিয়া (২২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এক পরিবারের চারজনসহ পাঁচজনের মৃত্যু স্থানীয়দের হতবাক করে দেয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। সংস্থাটির তথ্যে বলা হয়, একই বছরের এপ্রিলে বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২২ জন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণদের মধ্যেও এই আসক্তি ছড়িয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোনভিত্তিক বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ এবং অবৈধ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। এই জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ ছিনতাই, চুরি, অপহরণ এবং প্রতারণার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে ফেক আইডি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা এবং অর্থ আদায়ের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সাইবার অপরাধ দমনে এটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার তরুণদের আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে। অনেক কিশোর-কিশোরী রাতভর অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পাবজি, ফোর্টনাইট, মাইনক্র্যাফটসহ বিভিন্ন গেমে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে তাদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও বাড়ছে। শিশুদের একটি অংশ আক্রমণাত্মক ডিজিটাল কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে বলেও অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “দেশে এখন সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবারগুলো আগের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক বা সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারছে না। মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা, অবৈধ সম্পর্ক এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা মিলিয়ে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।"
তিনি বলেন, "আমরা এখন এমন কিছু ঘটনা দেখছি যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে নতুন সম্পর্ক বা নতুন জীবন শুরু করার চিন্তা করছে। এটি শুধু অপরাধ নয়, এটি সমাজের ভয়াবহ মানসিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধতা তৈরি করা জরুরি।”
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. রশিদুল হক বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম এমন একটি পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে নেতিবাচক বিষয়গুলো খুব দ্রুত তাদের সামনে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিদ্বেষ, অশ্লীল কনটেন্ট এবং সহিংসতার দৃশ্য নিয়মিত দেখছে তারা। এর ফলে তাদের মানসিক গঠন প্রভাবিত হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "অনেক তরুণ মনে করছে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে শর্টকাট পথ সহজ। এই মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজের ভেতরে যে নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হয়েছে, সেটি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় নৃশংসতার এই চক্র আরও গভীর হতে পারে।









