রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি আগস্ট মাস জুড়ে দলটির নেতাকর্মীদের ঘিরে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। চাঁদাবাজি, মাদক, সংঘর্ষ, হামলা, দখল, অস্ত্র প্রদর্শন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও দলীয়ভাবে বহিষ্কার, অব্যাহতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাস জুড়ে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ৯৩টি ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে মূল দল বিএনপিকে নিয়ে ৩৯টি ঘটনা এবং ছাত্রদলের বিরুদ্ধে এসেছে ৫৪টি অভিযোগ। কিছু ঘটনায় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা দলটির মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পরেছে। গত এক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযোগের ধরন যেমন বিচিত্র, তেমনি পরিস্থিতি সামাল দিতে দলীয় ব্যবস্থাও এসেছে নানা মাত্রায়।
চাঁদাবাজির অভিযোগে একাধিক ঘটনা
মাসজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল চাঁদাবাজি। রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, যুবদল ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১১ জন আহত হন। পরে এ ঘটনায় যুবদলের পাঁচ নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে জেলেদের কাছে ছয় লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আবার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও স্বত্বাধিকারীর কাছে ব্যবসা করতে হলে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার দাবি এবং রাজি না হওয়ায় মারধরের অভিযোগ আসে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দোকান বসিয়ে মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
মাসের শেষদিকে হবিগঞ্জের মাধবপুরে বাড়ি নির্মাণকাজ বন্ধ করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
মাদক নিয়েও বিব্রতকর পরিস্থিতি
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকে মাদকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাও মাসজুড়ে আলোচনায় ছিল। বিএনপির নেতৃত্বাধীস সরকারের পক্ষ থেকে মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি ছিল বিপরীত। শুধু আগস্ট মাসেই মাদক কাণ্ডে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ২৮ নেতাকর্মীর নাম উঠে এসেছে।
জামালপুরের মেলান্দহে মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। কুমিল্লায় মাদক সেবনের সময় যুবদল নেতাসহ ছয়জন আটক হয়ে পরে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পান। রাজশাহীতে ১১১ পিস ইয়াবাসহ বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার এবং বগুড়ার নন্দীগ্রামে ১ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ ছাত্রদল নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ইয়াবা সেবনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বরিশালের এক ছাত্রদল নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কুমিল্লায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া এক ছাত্রদল নেতাকে আজীবন বহিষ্কারের কথাও জানানো হয়।
নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ ও আধিপত্যের লড়াই
আগস্টে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। নরসিংদীর পলাশে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদল নেতা ইব্রাহিম আল মাসুম নয় দিন পর মারা যান। পরে ওই হত্যা মামলায় প্রধান আসামিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, দুই ভাইয়ের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকেই এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস কাউন্টার নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রী ওঠানো নিয়ে দ্বন্দ্বে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় দুটি বাস কাউন্টার, একটি চায়ের দোকান ও তিনটি মোটরসাইকেল। পটুয়াখালীর দুমকিতেও যুবদলের নতুন কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
নোয়াখালীতে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হওয়ার খবরও আসে। জাবিপ্রবিতে নিজেদের সংগঠনের নেতাদের মারধর, হুমকি এবং হলের সিট দখলের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে।
হামলা, মারধর ও প্রাণহানির অভিযোগ
মাসজুড়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঘিরে বেশ কিছু হামলা ও মারধরের ঘটনাও সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আবার যুবদল নেতার মারধরে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হয়।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে কৃষক দলের নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। এতে দুই নারীসহ পাঁচজন আহত হন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে এক কৃষক দল নেতাকে প্রবাসীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও প্রবাসীর স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
চট্টগ্রামে পণ্য বিক্রির রিকশাভ্যান বসানো নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবদল নেতার মৃত্যুর ঘটনায় বিএনপি নেতা পরিচয়ধারী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষি মেরে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি নিয়েও এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্য ও হামলা
গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে তথ্য জানতে গিয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে মহিলা দলের বহিষ্কৃত এক নেত্রীর বিরুদ্ধে। নাটোরের লালপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দুই সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ছাত্রদলের তিন কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়।
শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে তিন সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে জেলা যুবদলের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে। পরে ওই ঘটনায় এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আসে। ঢাকার দোহারে টিকিটের সিরিয়াল নেওয়াকে কেন্দ্র করে এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে শ্রমিক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে।
সরকারি দপ্তরেও উত্তেজনা
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের অন্তত ১৮টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিক্ষোভ, তালা ঝোলানো, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল ও বিএনপিপন্থীদের বিরুদ্ধে। কয়েকটি ঘটনায় কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি এবং একজন ইউএনওকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ছিল।
নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হয়। এর পরদিন জেলা প্রশাসক ও একজন ইউএনওকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে সরকারি আদেশে বদলির কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
দখল ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
আগস্ট মাস জুড়ে দখল এবং প্রভাব বিস্তারেরও একাধিক ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। টঙ্গীতে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দোকান বসানোর অভিযোগের পাশাপাশি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে অন্যের বাড়ি জবরদখলের অভিযোগে বিএনপির এক নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
বরিশালে বাস ও টেম্পোস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে দুই ভাইয়ের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তারা যথাক্রমে কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড ও সংলগ্ন টেম্পোস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন।
অস্ত্র প্রদর্শনেও সমালোচনা
পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা কাফনের কাপড় পরে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন হয়। পরে তিনি তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র থানায় জমা দেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাঁদা দাবির অভিযোগের ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনাতেও অস্ত্র, গুলি বা ককটেল ব্যবহারের অভিযোগ এসেছে।
শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দলীয় ব্যবস্থা
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে একাধিক ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদক, চাঁদাবাজি, সাংবাদিক লাঞ্ছনা, দখল, অনৈতিক আচরণ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিভিন্ন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার, পদ থেকে অব্যাহতি, পদ স্থগিত এবং শোকজ করা হয়েছে।
এর মধ্যে নিউ মার্কেটের ঘটনায় যুবদলের পাঁচ নেতা, সাংবাদিক লাঞ্ছনার ঘটনায় ছাত্রদলের তিন কর্মী, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় কয়েকজন নেতা এবং বাড়ি দখলের অভিযোগে বিএনপির এক নেতাকে বহিষ্কারের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া চাঁদাবাজির অভিযোগে সন্দ্বীপ উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতাকে বহিষ্কার এবং ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধ করতে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগে আরেক নেতাকে শোকজ করা হয়।
এক মাসের চিত্র কী বলছে?
দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ঘিরে বিতর্কের ধরন একক নয়। চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি মাদক, সংঘর্ষ, হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন, সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনাও রয়েছে।
বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ আধিপত্য ও কমিটি নিয়ন্ত্রণের বিরোধ কয়েকটি ঘটনায় সরাসরি সংঘর্ষে গড়িয়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। আবার অভিযোগ ওঠার পর দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও কম নয়।
এক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর জন্য মাঠপর্যায়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও নেতাকর্মীদের আচরণ কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে সেই প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নানাবিধ অপরাধে যুক্ত হওয়া সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃ্ঙ্খলা পরিস্থিতি আবনতি ঘটাচ্ছে। অভিযুক্তরা সরকারি দলের হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেও প্রশাসনের শিথিলতা দেখা যাচ্ছে।