মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘিরে বিএনপির দলীয় নেতৃত্ব ও সরকারের দায়িত্ব বণ্টনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মহাসচিবের পদ থেকে ফখরুলের সরে দাঁড়ানোর পরপরই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে একসঙ্গে চার নতুন মুখ যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শূন্য হতে যাওয়া মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব, ফখরুলের হাতে থাকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং সরকারের মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদল নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে যুক্ত হওয়া চার নেতা হলেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হালিম (ডোনার)। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়াতে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত করা হয়েছে।
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণার পরদিনই স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠনের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা কয়েকটি পদ পূরণে একসঙ্গে চারজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আলোচনায় থাকা কয়েকজন এবার কমিটিতে জায়গা পাননি। ফলে নতুন কমিটিতে কারা এলেন, আর কারা বাদ পড়লেন—এ নিয়েও দলের ভেতরে নানা আলোচনা চলছে।
নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ার পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে বর্তমানে সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঙ্গে নতুন চারজন এই কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হন। সে হিসাবে পূর্ণাঙ্গ কমিটির কাঠামো ১৯ সদস্যের। ফখরুলের পদত্যাগের পর তাঁর স্থায়ী কমিটির পদটিও শূন্য হয়েছে। ফলে নতুন চারজন যুক্ত হলেও পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর আরও কয়েকটি জায়গায় ভবিষ্যতে পরিবর্তনের সুযোগ থাকছে।
রিজভীর সামনে নতুন দায়িত্বের সম্ভাবনা
নতুন চার সদস্যের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর অন্তর্ভুক্তিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা রিজভী দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর দলের মহাসচিব পদে কে আসবেন, সেই প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে দলের আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, নতুন মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনোনয়নের এখতিয়ার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের।
তবে রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার পর তাঁকে সাংগঠনিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার মুখ
ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা আমানউল্লাহ আমান দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি। দীর্ঘদিন পর তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বর্তমানে সরকারের জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফরহাদ হালিম (ডোনার) পেশায় চিকিৎসক এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। নতুন চারজনকে নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে বলে মনে করছেন দলের সংশ্লিষ্টরা।
স্থায়ী কমিটির সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে এর আগে ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামও আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাউকে নতুন তালিকায় রাখা হয়নি।
মহাসচিব পদে রিজভীসহ একাধিক নাম
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়ার পর বিএনপির ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন মহাসচিব পদ নিয়ে। প্রায় ১৬ বছর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা ফখরুল দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় দীর্ঘদিনের একটি নেতৃত্বপর্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো নতুন মহাসচিবের কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনা হয়নি। তবে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার আলোচনা রয়েছে। তাঁকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত এই আলোচনাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে স্থায়ী কমিটির অন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলের আগে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ, নাকি সরাসরি নতুন মহাসচিব নির্বাচন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ফখরুলের মন্ত্রণালয়ে কে
ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলে তাঁর হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন নিয়ে বিএনপির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। বিকল্প হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
ফখরুলের মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি তাঁর সংসদ সদস্য পদও শূন্য হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং তাঁর সংসদীয় আসন—দুই জায়গাতেই নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদলের আলোচনা
এর সঙ্গে সরকারের ছয় মাস পূর্তিকে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদলের আলোচনা যুক্ত হয়েছে। সরকারের কাজের পর্যালোচনা করে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এমন কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রী করার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
তবে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনেও নতুন সমীকরণ
ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আসন ঠাকুরগাঁও-১-ও শূন্য হবে। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন এবং বড় মেয়ে মির্জা শামারুহের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
তবে মির্জা পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা শুধু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একটি নতুন নাম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, বিএনপির দলীয় নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণী ফোরাম, মন্ত্রিসভা এবং সংসদীয় রাজনীতিতেও একাধিক নতুন সমীকরণের দরজা খুলে দিয়েছে। স্থায়ী কমিটিতে চার নতুন মুখের প্রবেশ সেই পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান ধাপ। সামনে মহাসচিব নির্বাচন ও মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্তে সেই সমীকরণ কতটা বদলায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
যা বলছেন নেতারা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে গেলে দলের মহাসচিবের পদটি স্বাভাবিকভাবেই শূন্য হবে। এ পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হবে। তবে এখনই কোনো নাম চূড়ান্ত হয়নি। দলের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাউকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের পথেও যাওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, রুহুল কবির রিজভীকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি পদোন্নতি হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দলের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। এ নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয় কার হাতে যাবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
তাঁর ভাষ্য, মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদলের বিষয়টি শুধু ফখরুলের মন্ত্রণালয় পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে কোথায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটিও দেখা হচ্ছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা এবং বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা যোগ্য কয়েকজনকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা আছে।
তবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যেসব নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোকে চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দলের চেয়ারম্যান ও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, মহাসচিব পদে পরিবর্তন এবং সরকারের পরবর্তী পর্যায়ের কাজের ধরন বিবেচনা করেই দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি ঠিক করা হবে।