গেরুয়া উত্থানে কোণঠাসা মমতা, প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?

ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় যখন মানুষের বুক কাঁপে, তখন আগুনের আঁচ পাওয়ার কথা ছিল প্রশান্তির। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের হিজলি শরিফ কিংবা মেদিনীপুরের খেজুরি—সেখানে আগুনের যে লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে, তা তো উনুনের নয়। সে আগুন মানুষের ঘর পোড়াচ্ছে, পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে তিল তিল করে গড়ে তোলা রুটিরুজির শেষ সম্বলটুকু। যে জনপদে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বসে তামাক খেত, সেখানে আজ দাউদাউ করে জ্বলছে বিভেদের কাঠ। আগুনের রং সেখানে লাল নয়, বরং এক ভয়াবহ প্রতিহিংসার নীল বিষ ছড়িয়ে পড়ছে বাংলার আকাশে।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। নতুন সরকার গদিতে বসার আয়োজনে যখন তুবড়ি ফাটছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজ্যের আনাচে-কানাচে সংখ্যালঘুদের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কোচবিহারের সেই ‘ছোট মসজিদ’-এর দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের পাতাগুলো যখন জুতোর নিচে পিষ্ট হয় কিংবা মেঝের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে এই মাটির সহনশীলতার শিকড় কতটা আলগা হয়ে গেছে।
এক বৃদ্ধ মুসল্লি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। তাঁর চোখের পানি যেন শুধু ধর্মীয় আবেগের নয়, বরং এই বাংলার শত বছরের সম্প্রীতির কফিনবন্দি হওয়ার হাহাকার। তিনি বলছিলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে দেখছি এই উঠোনে সবাই আসত, আজ কেন এই বেইজ্জতি?”
বিজেপির এই উত্থানের নেপথ্যে যে রাজনীতির কারিকুরি রয়েছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। শুভেন্দু অধিকারীর ‘৭০-৩০’-এর ফর্মুলা বাংলার মানুষের মনে এমন এক দেয়াল তুলে দিয়েছে, যা পার হওয়া আজ প্রায় অসম্ভব। গেরুয়া আবির মেখে একদল উন্মত্ত যুবক যখন বাইক নিয়ে মহড়া দেয় আর সংখ্যালঘু পাড়ায় উস্কানিমূলক স্লোগান তোলে, তখন বুঝতে হয় প্রশাসনের মেরুদণ্ড কতটা নুয়ে পড়েছে।
শুধু মসজিদ নয়, টার্গেট করা হচ্ছে দোকানপাটকেও। খেজুরির নিচকসবা এলাকায় ৬০টিরও বেশি দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে হিন্দু দোকানদারও আছেন, মুসলিমও আছেন। কিন্তু রাজনীতির কারবারে যখন বিভেদ ঢুকে পড়ে, তখন কার ক্ষতি হলো সেটা বড় কথা নয়, বরং কাকে কত বেশি ভয় দেখানো গেল সেটাই যেন আসল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন একলা পথের পথিক। একাত্তর বছর বয়সে এসে যখন তিনি কালীঘাটের রবীন্দ্রজয়ন্তীর মঞ্চে দাঁড়ান, তখন তাঁর চোখে সেই পুরোনো লড়াকু মেজাজের চেয়েও বেশি যেন এক ধরনের ক্লান্তি আর একাকীত্ব খেলা করে। একসময় যিনি একা হাতে বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছরের দুর্গ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন, আজ তাকেই বলতে হচ্ছে—বাম, অতিবাম সবাই মিলে একজোট হও।
রাজনীতির এই অদ্ভুত বাঁককে আপনি কী বলবেন? যে বামপন্থীদের তিনি ‘চিরশত্রু’ ভেবে ঘরছাড়া করেছিলেন, আজ বিজেপির এই দানবীয় দাপট রুখতে তাঁদেরই বন্ধু বলে ডাক দিচ্ছেন। তবে সেই ডাক যেন মরুভূমির ওপর বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা জল। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দিদির এই ডাকের ভেতরে কোনো আন্তরিকতা নেই, আছে শুধু নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচানোর তাগিদ।
তৃণমূলের ভেতরে এখন আর সেই পুরোনো বাঁধন নেই। ঘরের কোন্দল এখন মাঝেমধ্যেই ছাদ ফেটে বাইরে বেরিয়ে আসছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘করপোরেট স্টাইল’ রাজনীতি আর আই-প্যাকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে দলের পুরোনো ঘোড়াদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই।
যে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় মমতার পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন, আজ তিনিও প্রকাশ্যেই আই-প্যাকের সমালোচনা করছেন। দলের মুখপাত্ররা একে একে পদত্যাগ করছেন কিংবা বিজেপির দিকে পা বাড়িয়ে রাখছেন। রিজু দত্তের মতো তরুণ তুর্কিরা যখন ভিডিও বার্তা দিয়ে শুভেন্দু অধিকারীদের কাছে ক্ষমা চান, তখন বোঝা যায় রাজনীতির বাতাস কোন দিকে বইছে।
দলের ভেতর অনৈক্যের এই সুর মমতার জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাঁটা। ভাইপোর প্রতি তাঁর অন্ধ স্নেহ আর প্রবীণ নেতাদের ব্রাত্য করে রাখার যে অভিযোগ উঠেছে, তা যেন তৃণমূলকে ভেতর থেকে উইপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। এই অবস্থায় রাজ্যের মানুষের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, বাংলায় যে কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান হয়েছে, মমতা কি পারবেন তাঁর ‘বিজেপি বিরোধী জোট’ দিয়ে এটাকে রুখতে?
পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায়, বিজেপির পাল্লা অনেক বেশি ভারী। ২০৭টি আসন নিয়ে তারা এখন ক্ষমতার মসনদে। তৃণমূলের হাতে মাত্র ৮০টি। বিধানসভার অন্দরে বিজেপির এই বিপুল সংখ্যাধিক্যের সামনে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কিংবা ফিরহাদ হাকিমদের লড়াইটা হবে নেহাতই অসম।
বিজেপি তো আর কেবল রাজনৈতিক দল নয়, তাদের পেছনে রয়েছে এক সুসংগঠিত মতাদর্শিক শক্তি। তারা এখন বাংলার খাদ্যাভ্যাসেও হাত দিতে চাইছে। বিরিয়ানি দোকান বন্ধের হুমকি কিংবা আমিষ খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির যে প্রচ্ছন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা বাংলার আদি সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত।
মমতা বলছেন, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি করেন না। কিন্তু মানুষ ভুলছে না তাঁর পনেরো বছরের শাসনামলের নানা কথা। দুর্নীতি আর ঔদ্ধত্যের যে পাহাড় তৃণমূলের চারপাশে জমেছে, বিজেপি আজ সেই ক্ষোভকেই পুঁজি করে নিজেদের ঘর গুছিয়েছে।
তবে মমতার একটা বিশেষ গুণ হলো তাঁর ফিরে আসার ক্ষমতা। ১৯৯১ সালে যাদবপুরে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে যিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন, তাঁর লড়াই করার ক্ষমতাকে ছোট করে দেখা বোকামি। কিন্তু এবারের লড়াইটা আলাদা। এবার প্রতিপক্ষ শুধু একটা দল নয়, এবার প্রতিপক্ষ হলো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মেরুকরণ। মানুষ যখন ধর্মীয় চশমা পরে ভোট দেয়, তখন উন্নয়নের স্লোগান কিংবা ‘কন্যাশ্রী’র চেক যেন ফিকে হয়ে যায়।
বিজেপির এই উগ্রবাদী রাজনীতির স্বরূপ বুঝতে হলে কোচবিহার থেকে বীরভূম অবধি একবার চষে বেড়াতে হবে। ঘরছাড়া কর্মীরা এখন জঙ্গলে কিংবা ভিনরাজ্যে আশ্রয় খুঁজছেন। যে মা তাঁর জ্বলন্ত ঘরের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করছেন, তাঁর কাছে কোনো জোট বা রাজনীতির সমীকরণ বড় নয়। তাঁর কাছে বড় হলো আজকের রাতের নিরাপত্তা।
এই যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা প্রশমিত করার মতো কোনো কার্যকর দাওয়াই মমতার হাতে আছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ জোটের ডাক দিলেও তাঁর নিজের দলের মধ্যেই এখন চরম বিশৃঙ্খলা। একদিকে অভিষেক ক্যাম্প, অন্যদিকে মমতার পুরোনো গার্ড—এই দুইয়ের লড়াইয়ে তৃণমূল এখন ছন্নছাড়া।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। তিনি চাইছেন রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলার কথা বলে আবার মানুষকে ফেরাতে। কিন্তু যেখানে মসজিদের মেঝেতে কোরআন পোড়ানো হয় আর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে দোকান লুণ্ঠন করা হয়, সেখানে সম্প্রীতির গান কি আদৌ কারও কানে পৌঁছাবে?
বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে এই লড়াইটা মমতাকে লড়তে হবে একদম নিচুতলা থেকে। শুধু কালীঘাটে বসে বিরোধী দলগুলোকে ফোন করলে বা সভা ডাকলে কাজ হবে না। যে মানুষগুলো আজ ঘরছাড়া, যাঁদের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু বয়স আর শারীরিক ক্লান্তি কি তাঁকে সেই সুযোগ দেবে?
বাংলার মানুষ শান্তিপ্রিয় ছিল। কিন্তু সেই শান্তিনিকেতনে আজ বিভেদের আগুন লেগেছে। বিজেপি এখন চাইছে বাংলাকে গুজরাট মডেলে সাজাতে। আর মমতা চাইছেন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। এই দুই শক্তির লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আজ যেভাবে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক কালো অধ্যায়। পুলিশ ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে তারা এখন নতুন প্রভুর ইশারায় চলতে প্রস্তুত। মমতা কি পারবেন এই সাম্প্রদায়িক ঝড় থামাতে? তাঁর জোটের ডাক আপাতত গালভরা বুলি ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। কারণ জোট গড়তে হলে যে বিশ্বাসের ভিত প্রয়োজন, তৃণমূল গত পনেরো বছরে সেই বিশ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলেছে।
বিরোধী বাম ও কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করার যে রাজনীতি মমতা শুরু করেছিলেন, আজ সেই বুমেরাং হয়ে তাঁর দিকেই ফিরে আসছে। বিজেপি-বিরোধী জোট তখনই সফল হতে পারত, যদি তাঁর দলের ভেতর স্বচ্ছতা থাকত। আজ যখন দলের নেতারাই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক কতটা নৈতিক জোর পায়, তা নিয়ে জনমনে সংশয় আছে।
রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে এখন আর হাসাহাসি নেই। আছে ফিসফাস আর চাপা আতঙ্ক। কার বাড়িতে কবে আগুন লাগে, কার নাম তালিকাভুক্ত হয়—এই দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম সাধারণ মানুষের। আজকের এই পশ্চিমবঙ্গে সত্য বড় বেশি একতরফা। সরকারি বিজ্ঞাপনে যখন সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, তখন মাটির নিচ থেকে ভেসে আসছে সংখ্যালঘুদের কান্নার সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা আজ এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষার মুখে।
বিজেপি যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছে, তার বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক জোট দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এক সামাজিক বিপ্লব। কিন্তু সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সতেজতা কি মমতার তৃণমূলের আর আছে? না কি এই বিভাজনের রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে বাংলাকে? কোচবিহারের সেই মসজিদের কান্নায় যে উত্তর লুকিয়ে আছে, তা বড় ভয়াবহ।
বাংলার মাটি যদি আজ ধর্মীয় বিদ্বেষের চাষ করে, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য কেবল পড়ে থাকবে এক ধ্বংসস্তূপ। মমতার জোট এই ধ্বংস রুখতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত দাউদাউ আগুনে পুড়ছে পশ্চিমবঙ্গ, আর সেই আগুনের শিখায় ছাই হয়ে যাচ্ছে মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসা। এই দহন থেকে মুক্তির পথ আজ বড়ই ধূসর।
মানুষের হাহাকার আর আগুনের শিখার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র যেন এক মরণকামড় দিচ্ছে। কে জিতবে আর কে হারবে, সেই হিসাব বোধহয় এখন অপ্রাসঙ্গিক। কারণ দিনশেষে হারছে পশ্চিমবঙ্গ, হারছে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ।
মমতার ডাকা ঐক্যের সুর কি তবে অরণ্যে রোদন হয়েই থাকবে? না কি এই ভাঙা ঘর থেকেই আবার নতুন করে গড়ে উঠবে প্রতিরোধের দেয়াল? বাংলার মানুষ এখন কেবল সেই অলৌকিক মুহূর্তের অপেক্ষায়।









