ছাত্রদলে ‘বঞ্চিত’ ত্যাগীরা, পুনর্বাসিত হচ্ছে ‘ছাত্রলীগ’!

পাথরচাপা কষ্টের মতো একটি দীর্ঘশ্বাস এখন জুলাই বিপ্লবের কারিগরদের বুকে। বুলেটের ক্ষত এখনো অনেকের শুকায়নি, অথচ ক্ষমতার মরীচিকা দেখে ভোল পাল্টাতে শুরু করেছে কেউ কেউ। যে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে গিয়ে শত শত তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেল, সেই ঘাতক বাহিনীর ক্যাডারদেরই এখন সসম্মানে বরণ করে নিচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা ছিল ছাত্র-জনতার প্রধান শত্রু, যারা হেলমেট পরে হাতে রামদা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুক ঝাঁজরা করে দিয়েছিল, তারাই এখন ছাত্রদলের ‘সাদা কাফন’ গায়ে জড়িয়ে নতুন করে শিক্ষাঙ্গন দখলের স্বপ্নে বিভোর। এ যেন বিপ্লবের সঙ্গে এক চরম বেইমানি এবং শহীদদের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এক নির্লজ্জ রাজনৈতিক তামাশা।
গত ৫ আগস্টের পর সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মনে এক চিলতে আশার আলো জেগেছিল। মনে হয়েছিল, দেশের শিক্ষাঙ্গনে অন্তত একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। অন্তত ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির সেই বীভৎস চেহারা আর দেখতে হবে না। কিন্তু ছাত্রদলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই আশার ওপর একের পর এক আঘাত হেনেছে।
দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে একযোগে ৪৫টি কমিটি ঘোষণা করেছে তারা। এই কমিটিগুলো ঘিরেই এখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ সামান্য নয়, বরং অত্যন্ত গুরুতর। খোদ জুলাই বিপ্লবের বিরোধিতাকারী নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পদধারী নেতাদের ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ—সবখানেই ছাত্রলীগের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘পুনর্বাসিত’ নেতাদের জয়জয়কার।
যারা কাল পর্যন্ত রাজপথে ছাত্রদলের কর্মীদের ওপর হামলা করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে, আজ তারাই ছাত্রদলের নব্য কাণ্ডারি সেজে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। যে সংগঠনটি দীর্ঘদিন নিজেদের ত্যাগ, আন্দোলন ও নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরে রাজনীতি করেছে, সেই সংগঠনের ভেতরেই এখন ত্যাগীদের হাহাকার আর সুবিধাবাদীদের উল্লাস দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ২৪২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অন্তত কয়েকজনের নাম এসেছে, যাদের অতীত ঘাঁটলে আঁতকে উঠতে হয়। তারা সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে শুধু জড়িতই ছিলেন না, বরং সেই সংগঠনের পদধারীও ছিলেন। বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের উপ-মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক মো. বজলুর রহমান বিজয় এখন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং হল সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত মাহাদী ইসলাম নিয়ন হয়েছেন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
এখানেই শেষ নয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বিদ্রূপ করা ব্যক্তিও পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় পদ। ত্যাগী কর্মীরা যখন গত ১৬ বছর ধরে জেল-জুলুম সহ্য করে দলের জন্য লড়াই করেছেন, তখন এই নব্যদের পদায়ন দেখে খোদ দলের ভেতর থেকেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
এই অবস্থায় সাধারণ কর্মীদের প্রশ্ন -যাদের হাতে ছাত্রদলের কর্মীদের রক্ত লেগে আছে, তাদের কেন আজ ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হচ্ছে? ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করে কি ছাত্রদল নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে না?
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে ঘোষিত ১২৭ সদস্যের কমিটিতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মীকে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কিছু নেতার প্রত্যক্ষ মদদে এই ‘ছাত্রলীগ পুনর্বাসন প্রকল্প’ চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৪ নম্বর সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল কিংবা ৩ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. বিল্লাল হোসেনদের অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, তারা শুধু ছাত্রলীগ করতেনই না, জুলাই বিপ্লবের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সামনের সারিতেও ছিলেন। এমনকি যে ছাত্রলীগ কর্মীকে জুলাই আন্দোলনের সময় সাধারণ ছাত্ররা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তাকে তালা ভেঙে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার কারিগররাও এখন ছাত্রদলের বড় নেতা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতামত উপেক্ষা করেই কেন্দ্র থেকে এই ‘পকেট কমিটি’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নেতারা। তাদের দাবি, এই কমিটি তাদের সুপারিশ করা তালিকার ধারেকাছেও নেই।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৫৯ ব্যাচের ১১ জন শিক্ষার্থী, যারা ছাত্রলীগের ২০২৩ সালের কমিটিতে পদধারী ছিলেন, তাদেরও ছাত্রদলের ৫১ সদস্যের কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একে ‘বাধ্যতামূলক পদায়ন’ বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের প্রশ্ন—যদি তারা সত্যিই বাধ্য হয়ে পদ নিয়ে থাকে, তাহলে ৫ আগস্টের পর কেন তারা বিপ্লবের বিরোধিতা করল?
একই চিত্র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। সেখানেও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের পদপ্রার্থী হিসেবে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার খবর ছড়িয়েছে। অভিযুক্তরা বলছেন, তারা কখনো ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অতীতের ছবি ও কর্মকাণ্ড ভিন্ন কথা বলছে।
মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে সত্যকে চাপা দেওয়ার এই চেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ছাত্রদলের এই নেতৃত্ব সংকট কেবল আদর্শিক বিচ্যুতি নয়, এটি গভীর সাংগঠনিক পচনেরও লক্ষণ। যুগের পর যুগ ধরে একদল বয়স্ক ব্যক্তি সংগঠনের শীর্ষ পদগুলো আঁকড়ে ধরে আছেন। ছাত্রত্ব অনেক আগেই শেষ হয়েছে, বিয়ে করেছেন, সন্তান হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত—এমন ব্যক্তিরাই এখন ছাত্রসমাজের তথাকথিত নেতা।
নোয়াখালী জেলা ও পৌর ছাত্রদলের কমিটিতে ১৮ জন বিবাহিত নেতাকে পদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের কমিটিতে এমন একজনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে, যিনি পেশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের একজন নিরাপত্তাকর্মী।
ছাত্রত্ব না থাকা কিংবা চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও তাদের পদায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রির অভিযোগও এখন সাধারণ কর্মীদের মুখে মুখে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ছাত্রদলের এই অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কিছু নেতার ইন্ধনে আবারও শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
ছাত্রলীগ ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি ইউনিটে গোপনে ‘পকেট কমিটি’ ঘোষণা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তারা এখন ছদ্মবেশে ছাত্রদলের ভেতরে ঢুকে সাংগঠনিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, তার পেছনেও এই অনুপ্রবেশকারীদের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
গত ২৪ এপ্রিল শাহবাগ থানার সামনে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছিলেন, সেটিকেও কেউ কেউ বৃহত্তর অস্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো—আদর্শিক লড়াইয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে সংগঠনগুলো সাধারণত অপপ্রচার, বিভাজন এবং কৃত্রিম শত্রু তৈরির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদলের ভেতরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আশঙ্কাকেই বাড়িয়ে তুলছে।
রাঙামাটিতে কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে।
কক্সবাজার ও বরিশালে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন পদবঞ্চিত কর্মীরা। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করা কর্মীরা।
তাদের চোখের পানি এবং অনুপ্রবেশকারীদের উল্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব যে সংকট তৈরি করছে, তার রাজনৈতিক মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ফ্যাসিবাদের স্থায়ী অবসান। কিন্তু ছাত্রদল যদি সেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পড়ে, তাহলে ছাত্রসমাজ তাদের ক্ষমা করবে না।
ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন এবং বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ছাত্রদল ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক মূল্য দেবে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে কোনো সংগঠন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ছাত্রদলের সামনে এখন দুটি পথ। ত্যাগীদের পাশে দাঁড়ানো, অথবা বিতর্কিত অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ডুবে যাওয়া।
সিদ্ধান্ত তাদের। কিন্তু বিচার করবে ইতিহাস।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









