‘চোরাচালান’ গল্পে সীমান্ত হত্যাকে বৈধতার চেষ্টা!
রাষ্ট্র কি নাগরিকের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা আজ দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর অন্যতম প্রধান সংবাদ। ঘটনার মৌলিক তথ্যগুলো আগে পরিষ্কার করা দরকার। শুক্রবার রাতে কসবার ধজনগর-পাথারিয়াদ্বার সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে নিহত হন দুই বাংলাদেশি। তাদের একজন মো. মুরসালিন (২০)। তিনি একজন কলেজশিক্ষার্থী। তার বাবার নাম হেবজু মিয়া। বাড়ি গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাতেনবাড়ি গ্রামে। অন্যজন নবীর হোসেন (৪০)। তার বাড়ি একই ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে।
ভারতীয় সীমান্তে বাংলাদেশি মৃত্যুর এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এই ধরনের ট্র্যাজেডির চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, এমন প্রতিটি ঘটনার পর বাংলাদেশে যেভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ান দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায়, সেটি। প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে যে, সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর আসবে, এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই “চোরাচালান”, “অবৈধ অনুপ্রবেশ”, “সংঘর্ষ” কিংবা “বিএসএফ সদস্যদের ওপর হামলা” ধরনের শব্দমালা সামনে চলে আসবে।
অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের আগেই রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভাষ্য সংবাদমাধ্যমে প্রধান জায়গা দখল করে নেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটিও সেই পুরোনো কাঠামোর পুনরাবৃত্তি কি না, সেই প্রশ্ন এড়ানো কঠিন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দু'জন হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাটি নিয়ে দেশের প্রায় সব প্রধান গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে। প্রথম আলো নিহত পরিবারের বক্তব্য এবং বিজিবির বিবৃতি —দুই পক্ষের তথ্যই তুলে ধরেছে। নিহত মুরসালিনের পরিবারের দাবি, শুক্রবার রাতে স্থানীয় কয়েকজন তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ গুলি চালালে তিনি নিহত হন এবং তাঁর মরদেহ ভারতের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্যদিকে বিজিবির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে প্রায় ১৫ জন বাংলাদেশি চোরাকারবারি ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহযোগিতায় ভারতের প্রায় ২০০ গজ ভেতরে প্রবেশ করেছিল। ফেরার সময় বিএসএফ তাদের বাধা দিলে বাংলাদেশিরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হয় এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে বিএসএফ “দুটি ছররা গুলি” ছোড়ে। এতে দুইজন গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান।

বিজিবির বিবৃতির ভাষা মনোযোগ দিয়ে পড়লে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে” বিজিবি যদি আগে থেকেই এত বিস্তারিত তথ্য জেনে থাকে, তাহলে চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের ভূমিকা কী ছিল? দ্বিতীয়ত, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও তারা কীভাবে নিশ্চিত হলো যে বাংলাদেশিরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হয়েছিল? তৃতীয়ত, কীভাবে তারা নিশ্চিতভাবে বলছে যে “দুটি ছররা গুলি” ছোড়া হয়েছে? ময়নাতদন্তের আগেই এমন নির্দিষ্ট তথ্য কোথা থেকে এল? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিজিবির বক্তব্যেই বলা হয়েছে, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া এবং মৃত্যুর তথ্য বিএসএফ তাদের নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ পুরো ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে তথ্যের উৎস আবারও বিএসএফ।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও বিএসএফের বয়ানকেই বৈধতা দিচ্ছে? আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের কিছু গণমাধ্যমও অনেক সময় সেই বয়ান প্রায় হুবহু প্রচার করে। রাষ্ট্রীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি অবশ্যই একটি তথ্যসূত্র; কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো, ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় সূত্রের তথ্য যাচাই করা। বিশেষ করে যখন বিষয়টি জীবন-মৃত্যুর। স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, আহতদের অবস্থান, সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা—এসব যাচাই ছাড়া কেবল একটি সরকারি ভাষ্যকে চূড়ান্ত সত্যে পরিণত করা সংবাদপত্রের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যায় না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আরও কিছু অসঙ্গতি আছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহত আরও কয়েকজন বাংলাদেশে ফিরে এসে কুমিল্লায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। যদি সবাই ভারতের ২০০ গজ ভেতরে অবস্থান করতেন, তাহলে আহতরা কীভাবে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরে এলেন? আর যদি গুলির ঘটনা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের কাছাকাছি ঘটে থাকে, তাহলে সেটি আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্ত হত্যা বহু বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল মানবাধিকার ইস্যুগুলোর একটি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই বিএসএফের হাতে অন্তত ২৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার'র দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ১৫ বছরে সীমান্তে কয়েক শত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিরস্ত্র ছিলেন। ২০১১ সালে ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন তুলেছিল। কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানীর মরদেহ দুই দেশের সম্পর্কের এক নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সে সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার কমানোর আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
২০২৫ সালেও সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি থামেনি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিক বাংলাদেশি নিহত বা আহত হয়েছেন। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর একই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে—চোরাচালান, অনুপ্রবেশ কিংবা সংঘর্ষ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রতিবাদপত্র পাঠানো বা পতাকা বৈঠকে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সীমান্তে নিহত প্রত্যেক বাংলাদেশির ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার। কী ঘটেছে, কোথায় ঘটেছে, কেন ঘটেছে—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিজিবির তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভাষ্য যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য রাষ্ট্রের সহিংসতার নৈতিক সাফাইয়ে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।
সবশেষে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের কাজ কোনো পক্ষের ভাষ্য পুনঃপ্রচার করা নয়; বরং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো। সীমান্তে যখন একজন বাংলাদেশি নিহত হন, তখন সেটি কেবল একটি সংবাদ নয়—এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। আমরা যদি প্রতিবার নিহত ব্যক্তির পরিচয়ের আগে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের গল্প শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যাই, তাহলে একসময় হত্যাকাণ্ডও স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় বিপদ সেখানেই।
সীমান্তে শুধু মানুষ মারা যাচ্ছে না, সত্যও অনেক সময় গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম—উভয়েরই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, তারা আসলে কার পক্ষে দাঁড়াবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।









