বাংলাদেশের আকাশটা আজ থমথমে। মেঘের আড়ালে যেন কোনো এক অশুভ ছায়া ঘাপটি মেরে আছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বদ্বীপ যখন নতুন করে নিশ্বাস নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই সীমান্তের ওপারে শুরু হয়েছে এক গভীর কুটিল চাল। মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে সেই পুরোনো এবং অতি ব্যবহৃত ‘জঙ্গিবাদ’ নাটক। এই নাটকের চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে দিল্লির নর্থ ব্লকে, আর নির্দেশনায় রয়েছে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। লক্ষ্য এবার অত্যন্ত পরিষ্কার ও সুদূরপ্রসারী _বাংলাদেশের গর্বিত বিমানবাহিনীকে পঙ্গু করে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানা। তাছাড়া বাংলাদেশে আবারও একটি পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকেও টার্গেট করেছে এই চক্র।
ঘটনার সূত্রপাত বুঝতে হলে আমাদের একটু নজর দিতে হবে সীমান্তের মানচিত্রের দিকে। অতি সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা তিনটি নতুন এবং শক্তিশালী সেনা ছাউনি বা সামরিক আউটপোস্ট স্থাপন করেছে। আসামের ধুবড়ি, বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া—এই তিনটি পয়েন্টই কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ড্রোনের লেন্সে ধরা পড়া ছবি এবং গোয়েন্দা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সেখানে ভারী মরণাস্ত্র ও সৈন্য সমাবেশ ঘটছে। দৃশ্যটা অনেকটা ২০২৪ সালে ইউক্রেনে হামলার আগে রাশিয়ার সৈন্য সমাবেশের মতো।
কিন্তু কেন এই আস্ফালন? কারণটা নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ তার বিমানবাহিনীকে এতটা আধুনিক করার সুযোগ পায়নি, যা এখন ঘটছে। চীন থেকে ২০টি জে-১০সি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি হয়েছে। এই বিমানগুলো কেবল আকাশেই লড়ে না, এগুলো একসঙ্গে ভূমিতে হামলা, জাহাজ ধ্বংস এবং শত্রুর রাডার জ্যাম করে দেওয়ার মতো বহুমুখী ক্ষমতায় বলীয়ান। এই বিমানগুলো মোতায়েন হওয়ার কথা কক্সবাজার ও বরিশালের ঘাঁটিতে। কক্সবাজার কেন? কারণ রোহিঙ্গা সংকটের মতো জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলায় আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেখানে থাকা জরুরি। আর ঠিক এই জায়গাতেই ভারতের সবচেয়ে বড় গাত্রদাহ। তারা চায় না বাংলাদেশ সামরিকভাবে স্বনির্ভর হোক।
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই বাংলাদেশে কোনো দেশপ্রেমিক সরকার ভারতের অন্যায় আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখনই দিল্লির গোয়েন্দারা ‘জঙ্গিবাদ’ তকমা দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একঘরে করার চেষ্টা করেছে। এবারও সেই চেনা কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। গত ২৩ এপ্রিল জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজে সেনাপ্রধান যখন বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিলেন, তার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মাথায় ভারতের ‘নর্থইস্ট নিউজ’ নামক একটি পোর্টালে একটি আজগুবি খবর প্রকাশিত হয়। চন্দন নন্দী নামের এক সাংবাদিক দাবি করেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে নাকি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ঢুকে পড়েছে।
খবরটির গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি একটি ডাহা মিথ্যা ও সাজানো গল্প। তারা দাবি করছে, ২০ এপ্রিল ভোরে অভিযানে অনেক বিমানসেনাকে আটক করা হয়েছে। অথচ খোদ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বা আইএসপিআর এ ধরনের কোনো ঘটনার কথা জানেই না। ভারতের এই প্রোপাগান্ডা মেশিনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের সামরিক সহযোগিতার যে নতুন সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, তাতে ফাটল ধরানো। তারা চায় না বাংলাদেশ জেএফ-১৭ থান্ডার বা জে-১০সি’র মতো শক্তিশালী যুদ্ধবিমান দিয়ে নিজের আকাশ রক্ষা করুক। বিমানবাহিনীকে বিতর্কিত করতে পারলেই ভারতের তৈরি করা সেই পুরোনো ‘জঙ্গিবাদ’ ন্যারেটিভ আবার বাজারে কাটতি পাবে।
ষড়যন্ত্রের কালো হাত শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি ধাওয়া করছে গণভবনের দিকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মাথাব্যথার কারণ মনে করছে ভারত। কারণ তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ কারও গোলামি করবে না। ভারতের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের করা সব গোপন ও দেশবিরোধী চুক্তি তিনি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতের প্রস্তাব ছিল শেখ হাসিনাকে আবার বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্সের বিদ্রোহীদের দমনে ঢাকার জমি ব্যবহার করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটি অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।
এই অনমনীয় অবস্থানের কারণেই ‘র’ এখন তারেক রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশের ভেতরে থাকা কিছু ‘স্লিপার সেল’ এবং ভারতীয় এজেন্টদের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে। পরিকল্পনাটি এমন—প্রথমে টিটিপি বা অন্য কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের নামে কিছু বড় নাশকতামূলক হামলা চালানো হবে। এরপর সেই ডামাডোলে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করা হবে।
শুধু তা-ই নয়, বিএনপির ভেতরে থাকা কিছু ‘গুপ্ত ও সুপ্ত’ এজেন্টের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বে বিভেদ তৈরি করে দিল্লি একটি অনুগত নেতৃত্ব বসাতে চায়। এই এজেন্টরা মুখে কান্নাকাটি করলেও তলে তলে দিল্লির পা চাটবে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব তুলে দেবে প্রতিবেশী দেশটির হাতে।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামটি শুনলে অনেকেই মনে করেন, এটি বুঝি কোনো ইসলামি জিহাদি সংগঠন। কিন্তু বাস্তবতা তাদের ধারণার চেয়ে ভিন্ন। টিটিপি আসলে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি প্রক্সি বাহিনী, যা মূলত পাকিস্তানের ভেতরে অশান্তি তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। আমেরিকার সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। এখন সেই একই বাহিনীকে বাংলাদেশে আমদানি করার চেষ্টা করছে দিল্লি।
সম্প্রতি কিছু খবর ছড়িয়েছে যে বাংলাদেশের কিছু তরুণ পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে। মজার বিষয় হলো, এদের পরিচয়ের গভীরে গেলে দেখা যায়, তাদের অনেকের সঙ্গেই ভারতীয় গোয়েন্দাদের যোগসূত্র রয়েছে। এটি একটি ডাবল গেম। একদিকে তারা উগ্রবাদকে উসকে দিচ্ছে, অন্যদিকে সেই উগ্রবাদের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আনার পাঁয়তারা করছে। তারা চায় না এ দেশের তরুণরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হোক; বরং তাদের বিপথে চালিত করে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে মেরে ফেলাই ভারতের লক্ষ্য।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বিমানবাহিনীর ভেতরে ‘র’ কতটা গভীরভাবে শেকড় গেড়েছিল। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় একসময় শিরোনাম হয়েছিল—‘বিমানবাহিনীর ভেতরে র-এর নেটওয়ার্ক ফাঁস’। সেই সময় ছয়জন শীর্ষ কর্মকর্তা র-এর সঙ্গে যোগাযোগের দায়ে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর সেই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। ঠিক এই কারণেই ভারত এখন ক্ষিপ্ত। তারা তাদের হারানো প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া। যে কর্মকর্তারা একসময় দিল্লির পা চাটত, তারা এখন অবসরে গিয়ে চক্রান্তের জাল বুনছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এখন দাবি করছে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ঘাঁটিতে নাকি টিটিপির আস্তানা। লক্ষ্য করুন, ঠিক যে পয়েন্টগুলো আমাদের ভবিষ্যতের আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্গ, সেগুলোকেই কেন টার্গেট করা হচ্ছে? কারণ একটাই—ভারতের গোয়েন্দারা চায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়া ব্যাহত হোক। তারা চায় না বাংলাদেশ ড্রোনের মাধ্যমে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’ পর্যবেক্ষণ করুক। বগুড়ায় চীনের সহায়তায় যে ড্রোন কারখানা হচ্ছে, তা দিল্লির জন্য বড় ভয়ের কারণ। তাই তারা এখন টিটিপির গল্প দিয়ে সেই কারখানা বন্ধ করার আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
শত্রু শুধু সীমান্তের ওপারেই বসে নেই, আমাদের ঘরের ভেতরেও আছে। দেশের কিছু বড় করপোরেট মিডিয়া এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এখন ভারতীয় গোয়েন্দাদের পাঠানো প্রেস রিলিজকে খবর হিসেবে পরিবেশন করছে। পুলিশের একটি অতি গোপনীয় চিঠি কীভাবে ভারতীয় সাংবাদিকদের হাতে চলে যায়? এর মানে হলো, আমাদের প্রশাসনের ভেতরে এখনো দিল্লির দালালরা বহাল তবিয়তে বসে আছে।
পুলিশের সেই চিঠিতে জঙ্গি হামলার যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তাকে পুঁজি করে ভারতীয় গোয়েন্দারা ডালপালা মেলছে। তারা একে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন বাংলাদেশ এখন আফগানিস্তান হয়ে গেছে। অথচ গত দুই বছরে দেশে কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি। ৫ আগস্টের পর যখন মানুষ মুক্তির স্বাদ পেতে শুরু করেছে, তখনই কেন এই জঙ্গি ভূতের উদয়? উত্তরটা পানির মতো পরিষ্কার—ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীল করে ভারতকে আবার এই দেশের অভিভাবক হিসেবে জাহির করা।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি ভারতের এই নীলনকশা বাস্তবায়ন হতে দেব? ৫ আগস্টের বিপ্লব কি দিল্লির হাতে দেশ তুলে দেওয়ার জন্য ছিল? মোটেও না। সাধারণ মানুষ আজ সজাগ। তারা বোঝে কে তাদের বন্ধু আর কে তাদের শত্রু। প্রধানমন্ত্রী যদি ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ট্রানজিট নিয়ে অনমনীয় থাকেন, তবে দেশের ১৮ কোটি মানুষ তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। এই ধরনের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এমনকি বিরোধী দলও সরকারকে সহযোগিতার কথা বলেছে। কোনো ‘জঙ্গি’ নাটকের ভয় দেখিয়ে এই জাতিকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না।
দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আবার জমাট বাঁধছে। তারা ভারত থেকে আসা পেঁয়াজ বা আলুর চেয়ে নিজের দেশের মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বকে বড় করে দেখে। ভারতের প্রোপাগান্ডা মেশিন যতই চিৎকার করুক না কেন, বাংলাদেশের মানুষ জানে যে এই টিটিপি বা জঙ্গি নাটকগুলো আসলে ‘র’-এরই প্রোডাকশন।
বাংলার আকাশ আজ ষড়যন্ত্রের কালো মেঘে ঢাকা, ঠিকই। কিন্তু সেই মেঘ সরিয়ে সোনালি সূর্য ওঠার সময় হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা যে স্লোগান দিয়ে রাজপথ দখল করেছিল, সেই স্লোগান ছিল—‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’। সেই একই স্লোগান আজও আমাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি। এই স্লোগান কোনো ধর্মের নয়; এটি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি।
আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক করার যে মহাপরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, সেখানে বিরোধী দলের সমর্থনও তারা পাবে। আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো ড্রোন বা ফাইটার জেট বিনা অনুমতিতে আমাদের সীমানায় ঢুকতে না পারে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও কোনো আপস করা যাবে না। দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক আজ একেকজন গোয়েন্দা, একেকজন প্রহরী।
দিল্লির দাদাগিরি এবং চক্রান্তের দিন শেষ। বাংলাদেশ কোনো দেশের করদরাজ্য নয়। বরং এটি বীর শহীদের রক্তে গড়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। চক্রান্তকারীরা মনে রাখুক—বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। যত নীলনকশাই হোক, দেশপ্রেমিক জনতার প্রতিরোধের মুখে তা ধুলোয় মিশে যাবে।
বাংলার আকাশ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। ভারতের কোনো নাটকই আর এই মাটিতে সফল হবে না।
বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে?
বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?