সরকারকে ব্যর্থ বলছে বিরোধীরা, রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে বিএনপি

সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা ও পাল্টা বক্তব্য জোরালো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এর সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি এবং প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার অভিযোগ তুলে সরকার ‘ফ্যাসিজমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী।
বিপরীতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘ব্যর্থ’ হওয়ার অভিযোগকে ঢালাও মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একই সময়ে সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা বর্তমান সংকটের জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি, দুর্নীতি ও আমদানি-নির্ভরতার দায় তুলে ধরেছেন।
সরকার: সংকটের দায় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের, উন্নয়নের দাবি
সরকারের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে বর্তমান সংকটের দায় আগের সরকারের ওপর চাপানোর পাশাপাশি সরকারের নানাবিধ উদ্যোগ ও ইতিবাচক কাজের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট সরকারের সৃষ্টি নয়; পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমদানি-নির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতির কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুও কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট করে আওয়ামী লীগ দেশকে ধ্বংস করে যাওয়ায় বিএনপি সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
একই সময়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে দেশের রাজনীতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অভিযোগ করেছেন, বিরোধী দল আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে জিম্মি করতে চাইছে।
বিএনপি: ‘সরকার ব্যর্থ’ অভিযোগ ঢালাও, বিরোধিতার জন্যই সমালোচনা
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে ব্যর্থতার অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করেছে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিনে ব্যর্থ হয়েছে—বিরোধী দলের এমন মন্তব্য ‘ঢালাও’ এবং তা যথার্থ নয়। তার মতে, বিরোধী দল বিরোধিতার জন্যই সরকারের সমালোচনা করে। একই সঙ্গে বিএনপি আগের তুলনায় আরও জনপ্রিয় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে সরকারের বর্তমান সমস্যাগুলোর জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া সংকটকে দায়ী করার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের জন্য কুইক রেন্টালভিত্তিক নীতির সমালোচনা করে বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে বর্তমান সরকারকে এসব সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জামায়াত: সরকার ফ্যাসিজমের দিকে যাচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি
সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর রাজনৈতিক অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরকার সরে যাচ্ছে এবং তা অস্বীকার করার চেষ্টা করছে। এ কারণে সরকার ‘ফ্যাসিজমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
জামায়াতের নেতারা একই সঙ্গে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোর কথাও বলছেন। ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিরোধী দলের ছায়া সরকারের আদলে ‘ছায়া সিটি করপোরেশন প্রশাসন’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। দলটির নেতাদের অন্যান্য বক্তব্যেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এনসিপি: ছয় মাসেই ব্যর্থতার দিকে বিএনপি সরকার
সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে এনসিপির সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সরাসরি। দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম অভিযোগ করেছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্যসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, শিল্পকারখানায় কর্মী ছাঁটাই, মধ্যবিত্তের ঋণগ্রস্ততা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
এনসিপির বক্তব্যে শুধু সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ড নয়, শিক্ষা খাতের ব্যবস্থাপনাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। দলটির সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ বলেছেন, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যান্য: সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সমালোচনা রয়েছে। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, সন্ত্রাস বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় ছয় মাসে সরকারের কোনো সাফল্য নেই।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও বলেছেন, সরকার গঠনের ছয় মাস পর জনগণ আর কোনো অজুহাত শুনতে চায় না; জনজীবনের জরুরি সংকট সমাধানে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও সরকারকে গণভোটের ব্যবস্থা এবং জুলাই সনদের অঙ্গীকার পূরণের আহ্বান জানিয়েছে।
একই সময়ে বাংলাদেশ লেবার পার্টি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার কথা তুলে ধরে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগদানের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি: সরকারবিরোধী সমালোচনার পাল্টা অবস্থান
সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ছাত্র রাজনীতিতেও। সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মিথ্যাচার ও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। অন্যদিকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা নির্ধারিত সময়ে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত না হলে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বিকাশ ঘটতে পারে।
এর বাইরে চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের অভিযোগও সামনে এসেছে। মিছিল থেকে শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দেওয়ার কথা বলা হলেও পুলিশ এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানে না বলে জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বার্তা
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এখন দুটি বিষয়, সরকার কতটা সফল, আর সরকার কি আগের সরকারের দায় সামলে এগোচ্ছে নাকি নিজেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে যাচ্ছে।
বিরোধীরা যেখানে ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, সেখানে সরকার ও বিএনপি নেতারা অতীত আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি, দুর্নীতি ও রেখে যাওয়া সংকটকে বর্তমান সমস্যার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। এর মধ্যেই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে নতুন কৌশলগত বিতর্কও রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত হয়েছে।








