একাধিক বিল নিয়ে সংসদে উত্তেজনা, কালো কাপড় বেঁধে বিরোধীদলের ওয়াকআউট

একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একই দিনে সংসদে খেলাপি ঋণ, এস আলমের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ, কৃষিঋণসহ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নও ওঠে।
সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক উত্তাপ কমেনি। লংমার্চকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আওয়ামী লীগকে নিয়ে অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতার বক্তব্য এবং ছাত্র রাজনীতিতে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি মিলিয়ে রোববারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংসদের উত্তেজনার প্রভাবও স্পষ্ট হয়েছে।
সংসদ: তিন বিল নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তি, ওয়াকআউটের মধ্যে পাস
সংসদে দিনের সবচেয়ে বড় উত্তেজনা তৈরি হয় তিনটি বিলকে কেন্দ্র করে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশন চলাকালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ পাসের বিরোধিতা করেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। পরে তিনটি বিল পাসের প্রতিবাদে তারা ওয়াকআউট করেন এবং মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তি ছিল আগে থেকেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে দুর্বল আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে তারা এর বিরোধিতা করে আসছে। রোববার বিলটি উত্থাপনের জন্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে আহ্বান জানান স্পিকার। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলটি পাসের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। গত ২৭ আগস্টও বিল দুটি সংসদে তোলার আগে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধীদল। সেদিন তাদের বক্তব্য ছিল, সংস্কারের মূল দাবিকে চাপা দিয়ে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে তারা চায় না।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়েও সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। সংশোধিত আইনে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ সন্তান বা নাতি-নাতনিকে, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন, এমন বিধান রাখা হয়েছে। বিরোধীদল এ বিধানকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বলে অভিযোগ করে বিলটির বিরোধিতা করে। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান আইনটি চলতি অধিবেশনে পাস না করে শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুপারিশ নেওয়ার দাবি জানান। তবে বিরোধীদলের আপত্তি নাকচের পর বিলটি পাস হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে বিরোধীদলের ওয়াকআউটের পাশাপাশি স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগও ওঠে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে মশকরা করেছেন। তিনি স্পিকারের আচরণকে পক্ষপাতদুষ্ট ও অত্যন্ত হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন।
সংসদে অর্থনীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে। এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ জুন ২০২৬ শেষে দেশের খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা হওয়ার তথ্য তুলে ধরে এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন এলসি খোলার বিশেষ অনুমতি দেওয়া এবং বিপুল ঋণের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ সুবিধা দিয়ে সরকার ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না—এ প্রশ্নও করেন তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো আইন ভঙ্গ করে ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র আইনি সত্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালিকের দুর্নীতির বিচার ব্যক্তিগতভাবে চলতে পারে, কিন্তু সেই কারণে সচল কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। কর্মসংস্থান, ঋণ ও দেশের অর্থনীতির সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক থাকায় ব্যক্তির অপরাধের জন্য কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ না করে আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ৩০ জুন ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। কৃষকদের পুরোপুরি সুদবিহীন ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তবে সরকার সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ হয়েছে, যার বড় অংশ ৪ শতাংশ সুদে দেওয়া হয়েছে।
সরকার: সুশাসনের বার্তা সরকারের, সংসদে অর্থনীতি-আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নানা প্রশ্ন
সংসদের ভেতরে বিল নিয়ে বিরোধের মধ্যেই সরকার তার নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নির্বাচনি ইশতেহারের মূল দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-কে সামনে রেখে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং দেশে সুশাসন সুদৃঢ় করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতিতে কোম্পানির ভূমিকা নিয়ে সংসদে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব হিসাব করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবেগের ওপর অর্থনীতি চলে না; আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।
এদিকে ডাকঘরের আধুনিকায়নে একটি চীনা কোম্পানি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারি তৎপরতা ছিল। ডিএমপির নিয়মিত অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে ৩৭টি মামলা দায়ের এবং ১২ হাজার ২২৮ পিস ইয়াবা ও ৬১০ গ্রাম গাঁজাসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সরকারের অবস্থান উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যু যেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক রাডারে সক্রিয় থাকে এবং অন্য কোনো বৈশ্বিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা না পড়ে। যৌথ প্রচেষ্টা ও কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি: লংমার্চের বিরোধিতা, সরকারকে ষড়যন্ত্রের সতর্কবার্তা
সংসদে বিরোধীদলের ওয়াকআউটের বাইরে রাজপথের কর্মসূচি নিয়েও বিএনপির অবস্থান ছিল স্পষ্ট। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, সংসদকে পাশ কাটিয়ে মাত্র ছয় মাসের মাথায় রাজপথে লংমার্চের নামে গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা চলছে। রোববার নয়াপল্টনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
একই সময়ে বিএনপির ভেতর থেকে সরকার ও দলকে ঘিরে সতর্কবার্তাও এসেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দলের ভেতর ও বাইরে থেকে সরকারবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। শনিবার ফার্মগেটে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
টুঙ্গিপাড়ায় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর গণসমাবেশে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতারা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে সেখানে বসে নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশে এসে রাজনৈতিকভাবে বিএনপির মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না বলেও মন্তব্য করেন।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করে তালা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লি ও তার ছেলে রিয়াজ মুসুল্লির নেতৃত্বে প্রায় ১৫০ জন দখল কার্যক্রমে অংশ নেন। মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগও করেন তারা।
জামায়াত: সংসদে বিলের বিরোধিতা, রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের বিরোধিতা থেকে শুরু করে রাজপথের লংমার্চ—দুই ক্ষেত্রেই রোববার জামায়াতের অবস্থান ছিল দৃশ্যমান। সংসদে দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সম্পত্তি হস্তান্তর বিলকে কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তা শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে শফিকুর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। সরকারি দলের লোকেরা সন্ত্রাস, চুরি-ছিনতাই ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে দাবি করে তিনি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত বিলের সমালোচনা করেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ জোটের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। দাবি আদায় না হলে আরও বড় কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন।
শনিবারের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ সফল হওয়ায় রোববার দেশবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি জানান, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের দাবিতে জামায়াতের অবস্থান নাকচ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য, শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা শিক্ষাঙ্গনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য বড় অন্তরায়।
এনসিপি: বিল নিয়ে ওয়াকআউট, খেলাপি ঋণ ও এস আলমের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন
সংসদে বিল নিয়ে বিরোধীদলের ওয়াকআউটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়েও সক্রিয় ছিল এনসিপি। দলটির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ দেশের বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ এবং এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন এলসি খোলার বিশেষ অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। বিশেষ সুবিধা দিয়ে সরকার ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না—এ প্রশ্নের জবাব চাওয়ার পাশাপাশি বিপুল খেলাপি ঋণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে সংসদে তিনটি বিল পাসের প্রতিবাদে বিরোধীদলের ওয়াকআউটের নেতৃত্ব দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে মশকরা করেছেন। তিনি এ আচরণকে সংসদের জন্য হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন এবং ঘটনাটিকে বিরোধীদলের নেতারা ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যান্য: এসআরবি বিল নিয়ে উদ্বেগ, সংসদে আইন সংস্কার ও জনস্বার্থের নানা দাবি
রোববার রাজনৈতিক ও নীতিগত বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত ছিল। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগকে নতুন মোড়কে অধিকতর ক্ষমতাপ্রাপ্ত ও জবাবদিহিহীন র্যাব তৈরির ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। তাদের মতে, প্রস্তাবিত আইনে ব্যাপক ও অস্পষ্ট ক্ষমতা, পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগ এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
পিতা-মাতার অবহেলা রোধেও সংসদে বক্তব্য দেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বাবা-মার সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনা বন্ধে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন আরও কঠোর করার পাশাপাশি চার দফা প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক নেপালের বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দুই দিনের সফরে নেপাল গেছেন। আর দলটির সংসদ সদস্য মাহবুবা হাকিম ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রো-লিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে দ্রুত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট চালু ও হাসপাতালটিকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন।
ছাত্র রাজনীতি: ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের উত্তাপ, তৎপর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগও
ছাত্র রাজনীতিতেও রোববার উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি তৎপরতা দেখা গেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাখা ছাত্রশিবিরের হল সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। সংঘর্ষের সময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়ার ঘটনাও ঘটে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়।
এই উত্তেজনার মধ্যেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ২৮ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। একইভাবে শরীয়তপুরে ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের কোটাপাড়া ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী দিনের আলোতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও কারাবন্দিদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত ওই মিছিলে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মিছিলের বিষয়ে আগে থেকে তাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শাকসু নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন। প্রশাসন নির্বাচন না দিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে ডাকসুর উদ্যোগে ১০টি আধুনিক কম্পিউটার নিয়ে ‘আইটি অ্যান্ড ক্যারিয়ার সেন্টার’ চালু হয়েছে।
ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আলামিন সাদাতকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করেছে শাখা ছাত্রদল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন নারী শিক্ষার্থীদের ফুল ও উপহার দিয়ে বরণ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রীসংস্থা।
রাজনৈতিক বার্তা: সংসদে উত্তাপ, রাজপথে পাল্টাপাল্টি চাপ
রোববারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংসদ ও রাজপথ; উভয় জায়গাই আলোচনায় ছিল। সংসদে তিনটি বিল নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তি শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউটে গড়িয়েছে। মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগের ঘটনা সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে দূরত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত বিল নিয়ে বিরোধীদলের আগের অবস্থান এবং সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে শরিয়াহসংক্রান্ত আপত্তি দেখিয়েছে, বিল পাসের প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও মুখোমুখি।
অন্যদিকে রাজপথে লংমার্চের মাধ্যমে সরকারকে চাপ দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের অবস্থানের বিপরীতে বিএনপি সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজপথের কর্মসূচির সমালোচনা করেছে। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেও সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশল নিয়ে ভিন্নতা স্পষ্ট হয়েছে।
এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ বা রক্তপাত নয়, দেশে সমঝোতার রাজনীতি দেখতে চান।
সব মিলিয়ে রোববারের রাজনীতিতে সংসদ ছিল উত্তেজনার প্রধান ক্ষেত্র। একাধিক বিল নিয়ে বিরোধীদলের ওয়াকআউট, অর্থনীতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ে প্রশ্ন, রাজপথের লংমার্চকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং ছাত্র রাজনীতির সংঘাত—সব মিলিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে চাপ ও পাল্টা চাপের রাজনীতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। একই সময়ে সমঝোতার রাজনীতির আহ্বানও জানিয়ে, রাজনৈতিক সংঘাত কমানোর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।









