জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিতর্ক এবং নানা টানাপোড়েনে সরগরম রাজনীতি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কর্মসূচি, বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দিনভর সরগরম ছিল রাজনীতি। সরকার একদিকে প্রশাসনকে জনকল্যাণে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে জুলাইয়ের শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে।
অন্যদিকে বিএনপি সরকারের কার্যক্রম, শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান এবং দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জ্বালানি খাতের নীতিমালা নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। এনসিপি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভারত অবস্থান নিয়েও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। একই সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ, মাদকসহ বিভিন্ন ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
সরকার: উন্নয়ন, প্রশাসন ও জনস্বার্থে নানা উদ্যোগ
শনিবার দেশের রাজনীতিতে সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনীতি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও ছিল আলোচনায়।
দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ইউএনওদের উদ্দেশে আয়োজিত সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।
এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও গুরুতর আহত পরিবারের ১০ সদস্যের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নিজ হাতে নিয়োগপত্র হস্তান্তর করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময়ে মানুষের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ আরও ভালোভাবে বসবাস করতে পারবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চিকিৎসক সমাবেশে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে প্রস্তাবিত বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বসুন্ধরা গ্রুপকে জ্বালানি তেল আমদানির নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগটি এ অবস্থান জানায়। সরকার জানিয়েছে, নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে গুগল, মেটা ও টিকটক। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও কঠোরতার বার্তা এসেছে। স্কুলের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো বন্ধের নির্দেশ দিয়ে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেছেন, নির্দেশ অমান্য করে কোনো শিক্ষক প্রাইভেট পড়ালে তাঁর এমপিও বন্ধ করে দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের স্কুলের পড়া স্কুলেই শেষ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করার কথাও বলেন তিনি।
কুড়িগ্রামে নদীভাঙন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনার পাইলট প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী ও রাজীবপুরের নদীভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপি: দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও মাঠপর্যায়ের নানা ঘটনা
শনিবার বিএনপির রাজনীতিতে দলীয় শৃঙ্খলা, সরকারের কার্যক্রমের পক্ষে বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ আলোচনায় ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকারের কাজে কোনো ধরনের গাফিলতি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমলাতন্ত্রের কেউ হোক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি—দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএনপি। শনিবার রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
মাঠপর্যায়ে অবশ্য বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা, মালামাল লুট ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের ভাইয়ের নামও এসেছে।
নরসিংদীর পলাশে এক বালু ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে তাঁর কানে বিএনপি নেতার কামড় দেওয়ার অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেছে পৌর বিএনপি। একই ঘটনায় মামলার বাদী ও জেলা ছাত্রদলের এক নেতার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
রাঙ্গামাটির লংগদুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতার সেগুনবাগান থেকে বিপুল অর্থমূল্যের গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগে বিএনপির এক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঝালকাঠিতে বিএনপি নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পরস্পরবিরোধী পোস্ট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি পাল্টা পোস্ট দিয়ে জবাব দিয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন।
অন্যদিকে ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে শেখ হাসিনা কীভাবে আন্তর্জাতিক একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রুহুল কবির রিজভী। তাঁর প্রশ্ন, ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কি যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারে?
জামায়াত: গণভোটের রায় বাস্তবায়নে চাপ, আওয়ামী লীগ ঠেকাতে উদ্যোগ
শনিবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর উদ্যোগ।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণভোট ব্যর্থ হলে এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। বরিশালে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এ বক্তব্য দেন।
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনে প্রস্তাবও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিবকে দেওয়া চিঠিতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। দায়িত্বশীলদের কাঙ্ক্ষিত মেজাজ নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে গাজীপুরে আয়োজিত এক শিক্ষাশিবিরে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার নিয়েও কথা বলেছেন সংরক্ষিত আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নি। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি।
জুলাইয়ের স্মৃতি ধারণে রাজধানীর উত্তরায় ‘জুলাই গ্রাফিতি আর্ট’ কর্মসূচি শুরু করেছে জামায়াত। একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে দলের প্রার্থী হিসেবে অধ্যাপক নূরুল হকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এনসিপি: জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ও দলীয়করণের অভিযোগ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে শনিবারও সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে গণআন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানের কর্মসূচিতে যাওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও তা করা হচ্ছে না।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণে নিরপেক্ষতা অনুসরণ করা হচ্ছে না; বরং দলীয় পরিচয়, আত্মীয়তা ও অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও বিএনপির বিরুদ্ধে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এক পথসভায় তিনি বলেন, ২০২৪ সালে তরুণ প্রজন্ম নতুন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একত্রিত হয়েছিল; কিন্তু দুই বছরের মাথায় বিএনপি সেই স্বপ্ন ভঙ্গ করেছে।
এদিকে জয়পুরহাট জেলা এনসিপির আহ্বায়ক গোলাম কিবরিয়া পদত্যাগ করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণের পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
দলটির সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেলের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কথিত ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’-এর বিরুদ্ধে বিকল্প বয়ান তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগ: নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা, হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক
আওয়ামী লীগকে ঘিরে শনিবারও নিষেধাজ্ঞা, দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল।
পাবনার সাঁথিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস শুকুরকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। পুলিশ শনিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। তিনি ভূলবাড়িয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন।
সিলেটের ওসমানীনগরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের চলাচলের পথে দেয়াল নির্মাণ করে একটি পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াতও বন্ধ হয়ে গেছে।
ভোলার বোরহানউদ্দিনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মসজিদের দরজা ভেঙে ইমামকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি দলটিকে সমাজের ‘নিকৃষ্ট’ মানুষের দল হিসেবে আখ্যায়িত করে দাবি করেন, আওয়ামী লীগ শুধু গত ১৭ বছর নয়, দেশের জন্মলগ্ন থেকেই দেশের ক্ষতি করে আসছে।
ইসলামী দল: জুলাই সনদ, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও জনকল্যাণের বার্তা
ইসলামী দলগুলোর রাজনীতিতে শনিবার জুলাই সনদ, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অন্য কোনো দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের বিরোধিতাও করেন তিনি।
অন্যদিকে জুলাই সনদ স্বাক্ষর নিয়ে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন মামুনুল হক। তাঁর দাবি, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্ধকারে রেখে সনদে গোপনে একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যান্য: আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি ও সংস্কার নিয়ে বিতর্ক
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে শনিবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে।
আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে গালাগালি নয়, যুক্তি, চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনা সভার বক্তারা। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক পরিসরে ফিরে আসাকেও স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করা হয়।
আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা সরকারের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। বরিশালের ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এ বক্তব্য দেন।
অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, আওয়ামী লীগের ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হয়েছে এবং দলটি আর বাংলাদেশে ফিরে আসবে না।
জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন না আসায় সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিকেরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে শহীদ পরিবারের সদস্যরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন এবং আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, বিরোধী দলগুলো কীসের বিরোধিতা করে এবং কোন বিষয়কে সমর্থন করে—তা মানুষ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না। দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর স্পষ্ট অবস্থান থাকা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্র রাজনীতি: ক্যাম্পাসে উত্তেজনা, ছাত্রদল-শিবিরের তৎপরতা
ছাত্র রাজনীতিতে শনিবার ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ আলোচনায় ছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের কারণে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে শিক্ষক প্রতিনিধিদের কেউ অধিবেশনে উপস্থিত হননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল সংসদের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে দুটি ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাকসু ভিপি মো. আবু সাদিক কায়েম।
ছাত্রদলের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে দুটি অভিযোগও সামনে এসেছে। শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ছাত্রদলের দুই নেতাকে ১৪ পিস ইয়াবাসহ স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ে ঢুকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাত্রদল নেতার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সতর্কতামূলক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য এসেছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, কোনো ক্যাম্পাসের হল দখল করে অছাত্র ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য করা যাবে না। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে গাইবান্ধায় আহত ছাত্রশিবির নেতা সালাউদ্দিন দীর্ঘ দুই মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। এর আগে বোনারপাড়ায় ছুরিকাঘাতে ছাত্রশিবিরের এক নেতা নিহত এবং সালাউদ্দিন গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট আয়োজন ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে কুমিল্লার দেবিদ্বারে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রশিবির। একই সঙ্গে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জুলাইয়ের চেতনাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বার্তা
শনিবারের রাজনৈতিক চিত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নকে ঘিরে নতুন মেরুকরণ। সরকার উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অর্থনীতি ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরছে। বিএনপি সরকার পরিচালনার সাফল্য ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগ সামলাচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। এনসিপি আরও সরাসরি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে গণআৃন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানের কর্মসূচিতে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে। ইসলামী দলগুলোর একটি অংশও জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
একই সময়ে আওয়ামী লীগকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞা, পুনর্বাসন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বিচারের প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে। ফলে জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির মূল প্রতিযোগিতা এখন শুধু সরকার পরিচালনা বা নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কে ধারণ করবে, রাষ্ট্র সংস্কারের গতিপথ কে নির্ধারণ করবে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর বৈধতার দাবি কার হাতে থাকবে—সেই লড়াইটিই ক্রমে সামনে আসছে।ৃ









