রাশেদ খাঁনের গুপ্ত রাজনীতি : একটি রং বদলের গল্প

বাংলাদেশের রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। এখানে আদর্শ ও নীতি অনেকটা শীতের সকালের কুয়াশার মতো। রোদ উঠলেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু আনুগত্য? সেটি বটগাছের শিকড়ের মতো। যত জল দেওয়া যায়, ততই গভীরে যায়। এই রাজনীতিতে প্রতিবাদের মঞ্চ অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের মতো। সেখানে পরিচয় হয়। যেন টকশোর স্টুডিওটা ইন্টারভিউ বোর্ড, আর ক্ষমতার করিডোর। সেটাই শেষ পর্যন্ত চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার কাউন্টার।
রাশেদ খাঁনের রাজনৈতিক পথচলাও অনেকের কাছে যেন এমনই এক চিত্রনাট্য। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রতিবাদের মুখ। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে লড়লেন। তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের ডাক, নতুন রাজনীতির স্বপ্ন, বিকল্প নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি। মনে হচ্ছিল, তিনি পুরোনো রাজনীতির দেয়ালে নতুন রঙের প্রলেপ দেবেন। কিন্তু রাজনীতি বড়ই বাস্তববাদী শিল্প। এখানে রং শুকানোর আগেই অনেক সময় ক্যানভাস বদলে যায়। তবে এটা কি রংবদল নাকি গুপ্ত ! সেটা আলোচনার দাবি রাখে।
নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করে জামানত হারানোর শঙ্কায় নির্বাচনের আগেই গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের চেয়ার ছেড়ে তিনি বিএনপির ধানের শীষে ভর করলেন। । মনে হলো, তিনি যেন রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে না উঠে সরাসরি লিফটে উঠে পড়েছেন। কিন্তু ঝিনাইদহ-৪ এর ভোটাররা সম্ভবত সেই লিফটের সুইচ বন্ধ রেখেছিলেন। ভোটবাক্সের দরজা খুলতেই দেখা গেল, লিফটটি সোজা বেসমেন্টে নেমে গেছে। বিজয়ীর ভোটের পাঁচ ভাগের এক ভাগও তাঁর ঝুলিতে জমল না। তখন নেটিজেনদের কেউ কেউ লিখেছিলেন "দল বদলানো যায়, ভোটার বদলানো যায় না।"
নির্বাচনের মাঠে ব্যাটে রান না এলেও টকশোর স্টুডিওতে তাঁর ব্যাটিং জমে উঠল। এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, কোনো অনুষ্ঠানে বিএনপির প্রতিনিধি না থাকলেও দর্শক নিশ্চিন্ত। রাশেদ খাঁন আছেন, স্কোরবোর্ড সচল থাকবে। দলের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র না হয়েও এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন দলের অবস্থান। জামায়াত কিংবা এনসিপি। যে দলই আলোচনায় আসুক, সমালোচনার কম্পাস যেন অদৃশ্যভাবে একই দিকেই ঘুরে যেত। দর্শকেরা কখনো কখনো ভাবতেন, রিমোট কন্ট্রোল কি টেলিভিশনের হাতে, নাকি স্ক্রিপ্টের হাতে?
তারপর একদিন সরকারি প্রজ্ঞাপন বের হলো। তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব। রাজনৈতিক জীবনে এটি অবশ্যই একটি বড় অর্জন। কিন্তু বাংলাদেশের ফেসবুক তো কোনোদিনই সরকারি গেজেটের ভাষায় কথা বলে না। সেখানে সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল ব্যঙ্গের হাট। কেউ লিখলেন "ওভারটাইমের বিল ক্লিয়ার হয়েছে।" আরেকজন বললেন "লয়্যালটি পয়েন্ট জমাতে জমাতে অবশেষে প্রিমিয়াম মেম্বারশিপ!" কেউ আবার লিখলেন "বাংলাদেশে সিভির চেয়ে টকশোর ভিডিও আর্কাইভ নাকি বেশি কার্যকর!"
অবশ্য এসবই নেটিজেনদের ব্যঙ্গ, বাস্তবতার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলবেন, দলে যোগ দেওয়া, দলের প্রার্থী হওয়া এবং পরে সরকারের দায়িত্ব পাওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবু রাজনীতির ইতিহাস বড় নির্মম। সেখানে অনেকের পদবি ভুলে যায় মানুষ, কিন্তু তাঁদের নিয়ে প্রচলিত উপমা ভুলে না। কেউ "আপসহীন" নামে বেঁচে থাকেন, কেউ "বিদ্রোহী" নামে, আবার কেউ এমন এক অভিধা পেয়ে যান, যেটি আর সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়েও বদলানো যায় না।
সময়ই শেষ কথা বলবে। ইতিহাস রাশেদ খাঁনকে কী নামে মনে রাখবে একজন দক্ষ রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে, নাকি এমন একজন হিসেবে, যাঁকে নিয়ে ফেসবুকের রসিকেরা লিখেছিলেন "বাংলাদেশে আনুগত্যও এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; লাভের অঙ্কটা শুধু একটু দেরিতে হাতে আসে।"









