২৯ আগস্ট শনিবারের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে গুম, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে সরকার, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক পক্ষই এ বিষয়ে অবস্থান জানিয়েছে। তবে একই ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। সরকার নিজেদের গুমবিরোধী অবস্থান ও অতীতের নির্যাতনকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল গুমবিরোধী আইনের কাঠামো, স্বাধীন তদন্ত এবং বর্তমান সময়ের অভিযোগগুলো সামনে এনে সরকারের জবাবদিহি চেয়েছে।
এর বাইরে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজধানীর যানজট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জামায়াতের রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে গণভোটের রায় ও সংস্কার বাস্তবায়ন, সরকারের অদক্ষতা এবং জনদুর্ভোগ। আর বিএনপির জন্য কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগও ছিল দিনের উল্লেখযোগ্য বিষয়।
সরকারের অগ্রাধিকার: গুম, জুলাই এবং আইনশৃঙ্খলা
সরকারের দিনের কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গুম ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুমকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও গুমের শিকার পরিবারের ৭৪ সদস্যের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং বিগত সরকারের গুম-খুনের বিষয়টি বিশেষভাবে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও নিজের ৬১ দিনের গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি।
তবে এখানেই সরকারের জন্য একটি পাল্টা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সরকারের বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দল ও অন্য রাজনৈতিক পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে। প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে রাখার বিষয়েও আপত্তি উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলার আরেকটি দিকেও সরকার সক্রিয় ছিল। অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন এবং তথ্যদাতাকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর বাইরে সরকার রাজধানীর যানজট কমাতে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আগামী গ্রীষ্মের আগে তিন হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরির আশার কথা জানিয়েছেন। খাদ্যমন্ত্রী খাদ্য নিরাপত্তাকে তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অর্থাৎ দিনের সরকারি বার্তায় তিনটি বিষয় স্পষ্ট ছিল: অতীতের গুম ও জুলাইয়ের স্মৃতি, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা এবং নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি।
বিএনপি: গুমের রাজনীতি, দলীয় পুনর্বিন্যাস এবং মাঠের অস্বস্তি
সরকারি দল বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যেও গুমের বিষয়টি ছিল সামনে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে সত্য প্রকাশ এবং পরিবারগুলোর জন্য স্বীকৃতি ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আইনটি নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করেই আইনটি তৈরি করা হয়েছে।
দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সিদ্ধান্তও আলোচনায় ছিল। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিএনপি এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করেছে।
তবে বিএনপির জন্য দিনের চিত্র পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ছিল না।
হবিগঞ্জে উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলা হয়েছে। চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা পরিচয়ধারী এক ব্যক্তির ঘুষিতে এক যুবদল নেতার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। দোহারে শ্রমিক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ এসেছে। দুমকিতে যুবদলের কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে ক্ষোভ দেখা গেছে। আবার বরগুনায় স্থানীয় অর্থায়নে তৈরি বাঁশের সাঁকো বিএনপি নেতা ফিতা কেটে উদ্বোধন করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে।
ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্বস্তি দেখা গেছে। নোয়াখালীতে কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। বগুড়ায় সাবেক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ এসেছে। মাগুরায় পুলিশ সদস্যকে থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনায় সাবেক ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার হয়েছেন।
ফলে কেন্দ্রীয় বিএনপি যেখানে মানবাধিকার ও জবাবদিহির কথা বলেছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড দলটির জন্য উল্টো রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
বিরোধী দল: গণভোট, গুমের স্বাধীন তদন্ত ও সরকারের ব্যর্থতা
জামায়াতে ইসলামীর দিনের রাজনীতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে: গুমের নিরপেক্ষ তদন্ত, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সরকারের অদক্ষতা ও জনদুর্ভোগ।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
অন্যদিকে দলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ৫০ কিলোমিটার যানজটের জন্য সরকারের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে। সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় একজন শিক্ষিকার মৃত্যুর পর রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত।
দলের বিভিন্ন নেতার বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এসেছে। তবে সবচেয়ে রাজনৈতিক বার্তাটি ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে। জামায়াত বলেছে, জনগণ যে পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। এ কারণেই দলটি রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্দোলন আরও জোরদার করবে।
অর্থাৎ বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের দিনের কৌশল ছিল নির্দিষ্ট জনদুর্ভোগকে সরকারের সামগ্রিক দক্ষতা ও সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা।
অন্যান্য রাজনীতি: ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এনসিপি ও নতুন বাংলাদেশের প্রশ্ন
দিনের অন্যান্য রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তেজনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর আগের বক্তব্য নিয়ে দুঃখ প্রকাশ এবং তথ্যগত ভুল স্বীকার করলেও বিতর্ক থামেনি। এনসিপির পূর্বনির্ধারিত সভাস্থলে কওমি ছাত্রদের ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম মোংলার নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান দাবি করেছেন। সারজিস আলম আবার বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখল বা মাদক ব্যবসার অভিযোগ পাওয়া গেলে সরাসরি তা বলার ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অনেক কিছু এখনো বহাল রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনও সরকারের ছয় মাসের কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার রেকর্ড নিয়ে সমালোচনা করেছে।
সব মিলিয়ে ২৯ আগস্টের রাজনীতি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। গুম ও জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়েই কথা বলছে, কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে তাদের অবস্থান ভিন্ন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যানজট, অপরাধ, সংস্কার এবং রাজনৈতিক কর্মীদের আচরণ ক্রমেই বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ রাজনীতি এখন শুধু অতীতের দায় নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে বর্তমান সরকারের ছয় মাসের পারফরম্যান্স নিয়েও। আর সেই জায়গাটিই আগামী দিনের সরকার-বিরোধী দলের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।