‘বাঙালি’ তকমায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে চায় মিয়ানমার?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আবারও অনিশ্চয়তা

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ যখন নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে, তখন মিয়ানমারের সাম্প্রতিক এক বিবৃতি সংকটটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসা মিয়ানমার এবারও তাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করে প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সামনে এনেছে। ঢাকার দাবি, মিয়ানমারের সর্বশেষ বিবৃতিতে ভুল পরিসংখ্যান ও বিতর্কিত বয়ান তুলে ধরা হয়েছে; দ্রুত যাচাই শেষ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন শুরু করাই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্র।
কিন্তু মিয়ানমারের এই অবস্থানকে নিছক পরিসংখ্যানগত বিরোধ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে পুরোনো ‘বাঙালি’ বিতর্ক সামনে এনে দেশটি প্রত্যাবাসনের মূল প্রশ্ন—নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ ভূমিতে ফেরার নিশ্চয়তা—থেকে আলোচনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ‘বাঙালি’ তকমা কি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকানোর মিয়ানমারের নতুন কৌশল? নাকি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় প্রত্যাবাসন নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন সর্বশেষ বিবৃতিতে?
মিয়ানমারের নতুন বিবৃতি
গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি বিবৃতি দেয়। এতে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা, তাদের পরিচয় এবং প্রত্যাবাসনের জন্য দেওয়া তালিকা নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। দেশটি দাবি করেছে, বাংলাদেশ যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে রোহিঙ্গা হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাঁদের সবাইকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে বলে মিয়ানমার জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করা হয়েছে। আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করার দাবিও করেছে দেশটি।
মিয়ানমার বলছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে তারা কাজ করছে। তবে প্রত্যাবাসনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বাস্তব নিশ্চয়তা এখনো স্পষ্ট নয়।
‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়েই ফিরতে হবে
মিয়ানমারের এই বক্তব্যের পর ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট আপত্তি জানানো হয়েছে। ১৮ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মিয়ানমারের বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিস্থিতি নিয়ে ভুল পরিসংখ্যান এবং বিতর্কিত বয়ান রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
এর আগে মঙ্গলবার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন মিয়ানমারবিষয়ক মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান। পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের দেওয়া পরিসংখ্যান ও বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়।
বাংলাদেশের মূল অবস্থান—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রাখাইনে ফেরত পাঠাতে হবে। শুধু যাচাই করে কিছু মানুষকে গ্রহণ করার প্রশ্ন নয়; প্রত্যাবাসনকে একটি টেকসই সমাধানের দিকে নিতে হলে পরিচয়, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তার বিষয়টিও সমাধান করতে হবে।
পুরোনো ‘বাঙালি’ বিতর্ক কেন আবার?
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা মিয়ানমারের নতুন কোনো অবস্থান নয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং তাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘বাঙালি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই পরিচয়গত বিরোধই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
কারণ রোহিঙ্গাদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় শুধু একটি জাতিগত পরিচয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত নাগরিকত্ব, অধিকার ও নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন। ফলে মিয়ানমার যখন প্রত্যাবাসনের আলোচনায়ও তাদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন বিষয়টি কেবল শব্দের বিতর্ক থাকে না—এটি প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার যদি সত্যিকার অর্থে প্রত্যাবাসনকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে পরিচয় বিতর্ককে সামনে না এনে দ্বিপক্ষীয়ভাবে যাচাই করা তালিকা অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ তৈরি করাই স্বাভাবিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা বদলে গেছে
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযান ও সহিংসতার পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ও পরের বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি।
কিন্তু ২০১৭ সালের পর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও বদলে গেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান এবং সামরিক জান্তার সঙ্গে তাদের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
রাখাইনের বড় একটি অংশে মিয়ানমার সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নেপিদোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে দেশটি স্পষ্ট করেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না।
আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণও বড় প্রশ্ন
রাখাইনে এখনকার বাস্তবতা ২০১৭ সালের পরিস্থিতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সে সময় অঞ্চলটির ওপর মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বর্তমানে আরাকান আর্মির সামরিক ও প্রশাসনিক প্রভাব অনেক বেড়েছে।
ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—মিয়ানমার সরকার যদি কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতেও চায়, তাহলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর নেতাদের বক্তব্য, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—দুই পক্ষের সঙ্গেই রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক জটিল। অতীতের নিপীড়নের স্মৃতি, বর্তমান সংঘাত এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার কারণে রাখাইনে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
এ অবস্থায় শুধু ‘যাচাই হয়েছে’ বলা হলেও প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা কঠিন হবে।
আগেও থেমেছে প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম দফায় প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় ফিরে যেতে রাজি হয়নি।
এরপর চীনের মধ্যস্থতায় ২০১৯ সালেও প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেবারও রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফেরানো সম্ভব হয়নি।
দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি চীনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ প্রত্যাবাসন নিয়ে মধ্যস্থতা ও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও টেকসইভাবে রাখাইনে ফেরানো যায়নি।
এবারও সেই পুরোনো সমস্যাগুলোই নতুন বাস্তবতায় ফিরে এসেছে—পরিচয়, যাচাই, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ।
চীনের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশও প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করতে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে চাইছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চীন মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রত্যাবাসনে চাপ প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে। তবে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতি দেখিয়েছে, কূটনৈতিক চাপ থাকলেও নেপিদোর অবস্থান এখনো মৌলিকভাবে বদলায়নি।
বরং ‘বাঙালি’ পরিচয়, সংখ্যাগত হিসাব এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনে মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের আলোচনাকে আবারও দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি করছে—এমন আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রত্যাবাসন, নাকি নতুন অচলাবস্থা?
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে এসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি কোথায়?
মিয়ানমার ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে—এটি একদিকে প্রত্যাবাসনের আলোচনায় একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় স্বীকার না করা, বিপুলসংখ্যক মানুষকে যাচাই না করা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরায় নতুন অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে; অন্যদিকে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের বিতর্কে না গিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক অবস্থান যদি কেবল আরও একটি যাচাই-প্রক্রিয়া ও সংখ্যাগত বিতর্কে আটকে যায়, তাহলে প্রত্যাবাসন আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
আর তাতে সংকটের বোঝা আরও দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ওপরই থেকে যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাই এখন প্রশ্নটি শুধু ‘কতজন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার যাচাই করেছে’—এমন নয়; বরং কতজনকে নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার নিশ্চিত করে ফিরিয়ে নেওয়ার বাস্তব প্রস্তুতি মিয়ানমারের আছে—সেটিই মূল প্রশ্ন।









