হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হবে না; ঢাকাকে জানাল দিল্লি
‘অসম্মানজনক আচরণ’ না করার অনুরোধ

ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না দিল্লি। শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে তার সঙ্গে যেন ‘অসম্মানজনক আচরণ’ না করা হয় এবং তার নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়, সে বিষয়েও ঢাকাকে অনুরোধ জানিয়েছে ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাস আগে একটি উচ্চপর্যায়ের ভারতীয় গোয়েন্দা প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নয়াদিল্লির এই অবস্থান জানিয়ে গেছে।
সোমবার অনির্বাণ দাসগুপ্তের নামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করতে নয়, বরং এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতেই গোয়েন্দা প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সফর করে। বৈঠকে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, শেখ হাসিনাকে কোনোভাবেই ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করা হবে না। তবে তিনি নিজে দেশে ফিরে গেলে তার সঙ্গে যেন কোনো ধরনের অসম্মানজনক আচরণ না করা হয়, সে বিষয়েও বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।
আনন্দবাজারের দাবি, ভারতীয় প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে তার নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনার বয়স এবং শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ডিসেম্বরেই ফিরতে চান হাসিনা
শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা একাধিকবার জানিয়েছেন। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে। তবুও তিনি দেশে ফিরতে চান। তিনি আরও বলেন, তার দলের নির্বাসিত ও আত্মগোপনে থাকা নেতারাও তার সঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
তবে শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে আনন্দবাজার। অর্থাৎ তিনি ভারতের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে ফিরবেন, নাকি নিজ উদ্যোগে অন্য কোনো উপায়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হবে। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত থেকে তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হলে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির জামিন পাওয়ার নজির বাংলাদেশে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারাগারে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা আপিল করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত হবে।
প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারত এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশের করা প্রত্যর্পণের অনুরোধটি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রত্যর্পণ না করার যে দাবি করা হয়েছে, সেটিকে এখনো নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে আনন্দবাজারের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, অন্যদিকে ভারতে তার অবস্থান অব্যাহত থাকা এবং এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রত্যর্পণ না করার বার্তা সামনে আসায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
দেশে ফিরলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় দিল্লি
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় প্রতিনিধিদলের মূল বার্তার একটি অংশ ছিল শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে, তাকে আটক করা হলে যেন কোনো ধরনের অসম্মানজনক আচরণ না করা হয় এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্যেও দেশে ফেরার ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা করা হতে পারে। তবে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মৃত্যু এলে নিজের দেশের মাটিতেই যেন তা আসে।
এদিকে দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তা ইস্যুতেও ভারতের উদ্বেগ
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার প্রায় ছয়জন সন্দেহভাজন সদস্যের উপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উদ্বিগ্ন। তাদের মধ্যে চারজন অতীতে কাশ্মীরে সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ বিষয়টি ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে একদিকে তার নিজের দেশে ফেরার ঘোষণা, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের তাকে ফেরানোর চেষ্টা এবং ভারতের কথিত প্রত্যর্পণ না করার অবস্থান, সব মিলিয়ে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং ফিরলে তার বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।









