নির্বাচন কমিশন দখলের অভিযোগ বিরোধীদের

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে মো. সামসুল আলমকে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সোচ্চার হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে।
একই অভিযোগে আরও সরব হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপি নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় লোক বসাচ্ছে। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ‘দলদাসে’ পরিণত করা হচ্ছে।
এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে সময় চাওয়া হবে। এর আগে রোববার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। একই দিনে সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সপরিবারে বঙ্গভবন ছেড়ে গেছেন।
সরকার: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে, ইসি নিয়োগ নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের একদিন পরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্পিকারের সঙ্গে ইসির আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নতুন নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের চুক্তিতে মো. সামসুল আলমকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এ নিয়োগের বিরোধিতা করে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে যিনি দীর্ঘদিন সোচ্চার ছিলেন, তাঁর অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না।
এদিকে সরকারের বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে এনসিপি। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপি এখনই নিজেদের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কাজ শুরু করেছে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ লোকদের জায়গা হলেও সেখানে দলীয় ব্যক্তিকে বসিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
ঝিনাইদহে এক পথসভায় আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি প্রশাসনকে দলদাসে পরিণত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত: বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীর অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়
ইসি সচিবালয়ে মো. সামসুল আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সোচ্চার ছিলেন এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে তাঁর অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়।
জামায়াতের এই বক্তব্যের পেছনে মূল উদ্বেগ হলো—নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বা কোনো দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
দলটি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সময়সূচি নিয়ে দাবি তুলেছে। জামায়াতের নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আগে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গ্যাস সংকটে নাগরিক ভোগান্তি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জামায়াত।
এনসিপি: নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে এখনই পথ তৈরি করছে বিএনপি
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিএনপির প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছে এনসিপি। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের অভিযোগ, বিএনপি আগামী নির্বাচনে নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোক বসাচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ লোকদের জায়গা। সেখানে দলীয় কর্মী বসিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি আগামীতে কীভাবে ক্ষমতায় থাকবে, এখনই সেই পথ তৈরি করছে।
এনসিপির এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে স্পিকারের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও এর আগে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে সহযোগিতা না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিএনপি: জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি নয়
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও দলের নেতারা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কথা বলছেন।
রোববার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের সুযোগ থাকবে না। জনগণের অধিকার নিয়ে কেউ যাতে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তবে একই সময়ে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বললেও প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতিই ফিরে আসছে।
আওয়ামী লীগ: আদালত ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক অভিযোগ
নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের বাইরে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিচারিক প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছে একটি সংগঠন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভারে শিক্ষার্থী শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন হত্যার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর (অব.) খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে এক রাতে তিনজনকে হত্যার অভিযোগ উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক বার্তা কী?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু সেই নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
জামায়াত বলছে, বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন এমন ব্যক্তির অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এনসিপির অভিযোগ, বিএনপি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে দলীয় লোক বসাচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইসি স্পিকারের সঙ্গে তফসিল নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক নিয়োগের প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি নিয়োগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগামী দিনের নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে, প্রশাসন কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কোন রাজনৈতিক শক্তির হাতে থাকবে—এসব মৌলিক প্রশ্ন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ দেশের রাজনীতিতে নতুন করে ক্ষমতার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।









