উচ্ছেদ নয়, জঙ্গল সলিমপুরে কারাগার নির্মাণের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
শিগগিরই যৌথ অভিযানের বার্তা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নতুন কারাগার নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে কারাগার নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হবে—এমন গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এখনই কাউকে উচ্ছেদ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর, বেতুয়া ও আশপাশের এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
রোববার (৩১ মে) দুপুরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি কুচক্রী মহল সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাস্তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। তবে এলাকার নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এখানে আর কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য থাকতে দেওয়া হবে না। পরিকল্পিত ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে পুরো এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে।”
তিনি জানান, শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, বেতুয়া এবং পার্শ্ববর্তী চা-বাগান এলাকাগুলোতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে। এসব এলাকায় যেসব সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে আলীনগর-জঙ্গল সলিমপুর অঞ্চল সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। আমরা সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে চাই। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দেশব্যাপী অপরাধ দমনের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। এই চার ধরনের অপরাধকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হবে।
তিনি বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজি সমাজকে ধ্বংস করছে। এসব অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জুয়া নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের জুয়া আইন দিয়ে আধুনিক অনলাইন বেটিং, অনলাইন জুয়া কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক জুয়ার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “সময়ের বাস্তবতায় নতুন আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমরা আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি আগামী সংসদ অধিবেশনেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত সংশোধনী আনা সম্ভব হবে।”
মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে হাজার হাজার মাদক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
“নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে মাদক মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীরা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর বার্তা যাবে,” বলেন তিনি।
কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের কিছু ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনেক কিশোর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। পরবর্তীতে তাদের একটি অংশ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রে পরিণত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “কিশোর অপরাধ মোকাবিলায়ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “আইনি সংস্কার, পরিকল্পিত অভিযান এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশকে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
এ সময় ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।









