মেগা প্রকল্প, সমাবেশ ও সীমান্ত ইস্যুতে উত্তপ্ত রাজনীতি; বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
জনমতের লড়াইয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব কৌশল ও আদর্শিক অবস্থানে থেকে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্র পরিচালনা ও বড় প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনসম্পৃক্ততা এবং জাতীয় ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশাসনিক উন্নয়ন, শোকাবহ পরিবেশ এবং তৃণমূল পুনর্গঠনের এক বহুমাত্রিক চিত্র দেখা গেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন বার্তায় সক্রিয় বিএনপি
বুধবার ক্ষমতাসীন বিএনপির কর্মকাণ্ডে যেমন ছিল মেগা প্রকল্পের অনুমোদন, তেমনি ছিল আগামী কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলায় বিশেষ গুরুত্ব।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আজ একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় দেশের নদী ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান আজ রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার কেবল ক্ষমতা নয়, বরং টেকসই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে বিশ্বাসী।
নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আজ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের জেলা নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ডিসেম্বরের জাতীয় কাউন্সিলের আগে সদস্য সংগ্রহ অভিযান জোরদার করার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আজ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের মাতার মৃত্যুতে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে শরিক হন। এছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে সংস্কার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। পাশাপাশি ক্রিকেট দলের টেস্ট জয়ে অভিনন্দন জানিয়ে জাতীয় সংহতি প্রকাশ করেছে দলটি।
সামাজিক সংহতি ও সমাবেশমুখী জামায়াত
বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী আজ বিভিন্ন স্তরের জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা ও রাজপথের বড় কর্মসূচির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের আকদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এটি রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
আগামী ১৬ মে রাজশাহীতে ১১-দলীয় জোটের প্রথম বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে আজ উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলায় লিফলেট বিতরণ ও পথসভা করেছে জামায়াত।
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রচিত ৫টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া পাকিস্তান জামায়াতের প্রতিনিধি দলের সাথে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনকে নিয়ে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ সংবাদের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন এবং কালীগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষককে গাভী উপহার দিয়ে মানবিক কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে দলটি।
মাঠে সক্রিয়তা ও কৃষক স্বার্থে এনসিপি
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও কৃষকদের সমস্যা নিয়ে রাজপথে সরব ছিল।
কসবা সীমান্ত সফরের ওপর ভিত্তি করে আজ সংবাদ সম্মেলনে মুখ্য সংগঠক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী সীমান্ত হত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপের দাবি জানান। তিনি ঘোষণা দেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে দেশের ৩২ জেলায় সীমান্ত সমাবেশ করা হবে।
এনসিপির কৃষি সেল আজ ধান কেনায় সরকারি শর্ত ও অতিবৃষ্টিতে কৃষকের দুরাবস্থা নিয়ে বিশেষ সেমিনার আয়োজন করে সংকট উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছে।
ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে ইসলামী ও বাম দল
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের সাম্প্রতিক নৃশংসতার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইন ব্যাখ্যা না দিয়ে তা প্রয়োগে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দলের আমির পীর সাহেব চরমোনাই লক্ষ্মীপুরে প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নেন।
হামে শিশুমৃত্যুর দায়ে দায়ীদের বিচারের দাবিতে ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করেছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে ঢাবিতে সমাবেশ করেছে।
ছাত্র রাজনীতিতে বহুমাত্রিক তৎপরতা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাবি সফরের প্রভাব ধরে রাখতে আজ ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ‘সুশাসন’ নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করেছে সংগঠনটি। এছাড়া ঢাবি ছাত্রদল নেতা সাম্যর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ সভা এবং দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
‘ঐতিহাসিক কুরআন দিবস’ পরবর্তী ফলোআপ হিসেবে আজ দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছে সংগঠনটি।
রাজনৈতিক বার্তা কী?
১৩ মে-র সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন বিএনপি মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে শাসন সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় গুরুত্ব দিচ্ছে। জামায়াত চেষ্টা করছে সামাজিক ইমেজ ও বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক জনসমর্থন প্রমাণের। আর এনসিপি ও বাম শক্তিগুলো সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও জাতীয় ইস্যুতে সোচ্চার থেকে বিকল্প ধারার রাজনীতিতে জোর দিচ্ছে।









