দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নিয়ে সরকারের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দ্বিমুখী বক্তব্য ও তথ্য দিচ্ছেন। কখনো বলা হচ্ছে দেশে জঙ্গিবাদ আছে, আবার কখনো বলা হচ্ছে জঙ্গিবাদ নেই। এরমধ্যে আবার পুলিশের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী উগ্রপন্থী হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হচ্ছে। স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্টানগুলোর এমন বিপতরীমুখী বক্তব্য এবং অবস্থানের ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার একইদিনে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জঙ্গিবাদ ইস্যুতে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ‘জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই’
আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোস্টগার্ড সদর দপ্তরে বাহিনীর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কোস্টগার্ডের সদরদপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জঙ্গিবাদ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই।
এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “দেশে জঙ্গি উত্থানের বিষয় জানা যাচ্ছে এবং বিমানবন্দরে নিরাপত্তাও বাড়ানো হচ্ছে। তো এই বিষয়টি আপনারা...।”
তার কথার সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোন তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ থাকে। পৃথীবির সব দেশেই এরকম একটিভ থাকে। র্যাডিকাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পার্টি থাকে। এগুলো আমরা ইউজ টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নাই। আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময়। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে তারা ব্যবহার করতো। বর্তমানে বাংলাদেশে এগুলার এক্সিসট্যান্স (অস্তিত্ব) নেই।”
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বললেন, ‘জঙ্গি নেই এটি ভুল কথা’
অন্যদিকে একই দিনে সচিবালয়ে পিআইডি’র সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “ইন্টেরিমের সময়ে এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। এটাও আরেকটা এক্সট্রিম। এটাও ভুল কথা। বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি, জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই।”
সম্প্রতি পুলিশের সতর্কতার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, “এবার এই সতর্কতার মানে হচ্ছে, এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে কারণ দেড় বছর ইন্টেরিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সেটারই খানিকটা চাপ, খানিকটা ইমপ্যাক্ট আমরা বলতে পারি।”
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আরো বলেন, “এই সরকার এগুলো কমব্যাট করবে। জনগণকে এটুকু বলতে চাই, এই ঝুঁকি এমন না যে এটার জন্য ভয় পেতে হবে। কিন্তু সেই পুরনো কথা, আমরা যদি কোনো একটা সংকটকে বা ডিজিজকে স্বীকার না করি, এটা চিকিৎসা হবে না। সো ইট'স দেয়ার। আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।"
তবে ডা. জাহেদ আরো বলেন, "বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। এখানে দুটো এক্সট্রিম আছে, আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি। আগের সরকারের সময়, ইন্টেরিম সরকারের আগের সরকারের সময় জঙ্গি সমস্যাকে যেই স্কেলে দেখানো হয়েছিল, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে। সুতরাং আমি নির্বাচন করলাম কি না দেখার দরকার নেই, আমাকে ক্ষমতায় রাখো। দ্যাট ওয়াজ আ ন্যারেটিভ। এটা বাড়াবাড়ি হয়েছিল ওই সরকারের সময়।”
উগ্রবাদী সংগঠনের হামলার আশঙ্কায় পুলিশি সতর্কতা
এদিকে দেশে উগ্রবাদী সংগঠনের হামলার আশঙ্কা করে পুলিশ সদর দপ্তর গত সপ্তাহে জারি করেছিল একটি সতর্কবার্তা। ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সংস্থাটির দেশব্যাপী শাখাগুলোতে পাঠানো বার্তায় উল্লেখ করা হয়, “নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামীর সঙ্গে একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের যোগাযোগের তথ্য পেয়ে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবন, পুলিশ-সেনা স্থাপনা, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অস্ত্রাগারে বোমা বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।”
পুলিশের আনুষ্ঠানিক বার্তায় উগ্রবাদী সংগঠনটির পরিচয় উল্লেখ করা না থাকলেও একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন টিটিপি (তেহরিক-ই তালেবান) এর সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সশস্ত্র বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে।
এরমধ্যে গত ২৭ এপ্রিল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। তিনি বলেছেন, “পুলিশ সদর দপ্তরের একটি চিঠির পর দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাভুক্ত (কেপিআই) হওয়ায় সব সময়ই কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে থাকে। তবে ওই চিঠি পাওয়ার পর নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে।
জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে বর্তমান সরকার
গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দায়িত্ব নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা এক ডজনের বেশি ব্যক্তিকে বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র।
এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে অন্তত ১৬ জনকে গ্রেফতার হয় বলে গত মার্চ মাসে খবর প্রকাশ করেছিল দ্য ডিসেন্ট।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও দেয়া হতো দ্বিমুখী বক্তব্য
দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব আছে কি নেই- এই ইস্যুতে এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, পুলিশের আইজিপি বাহারুল ইসলাম, এবং ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছিল।
২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে সংবাদমাধ্যম সময়ের আলোতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, “বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গি হতে পারে না। বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। আছে কিছু চোর-ছিনতাইকারী। আগে জঙ্গিবাদের প্রলেপ দিয়ে নাটক সাজানো হতো। ইতিমধ্যে জাহাজবাড়িসহ কয়েকটি ঘটনার আসল সত্য প্রকাশ পেয়েছে। অন্য ঘটনাগুলোরও আসল সত্য সামনে আসবে বলে বিশ্বাস করি। সুতরাং বর্তমানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দেশে কোনো ঝুঁকি নেই। বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় দেশ। এটি সবসময় বজায় থাকবে বলে মনে করি।”
একদিন পর ২৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পুলিশ সপ্তাহের আগে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “দেশে টোটালি কোনো জঙ্গি নেই- এরকম নিশ্চয়তা তো কেউ দিতে পারে না। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য দেশে অনেকগুলো অর্গানাইজেশন আছে। এর আগে অনেকেই জঙ্গিবাদের অভিযোগে অন্তরীণ হয়েছেন, অনেকে কারাভোগ করেছেন।
তিনি আরো বলেছিলেন, “২০০৫ এর দিকের জেএমবির ইতিহাস তো আমরা জানি। আমরা সজাগ আছি তাদের বিষয়টি নিয়ে, যারা এরকম কর্মকাণ্ডে যুক্ত। অন্তত এ নেটওয়ার্ক মোকাবেলা করার সক্ষমতা আমাদের আছে, এটা আমরা বলতে পারি।”
কয়েকমাস পর ২০২৫ সালের ৬ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভিলেজ ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের হিমাগার পরিদর্শন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, “বিগত ১০ মাসে আপনারা জঙ্গিবাদের কোনো তথ্য দিতে পেরেছেন? যখন ছিল তখন দিয়েছেন। এখন নেই, তাই দিতে পারেন না। বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদ নেই।” তিনি আরো বলেছিলেন, “সকলের সহযোগিতায় জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে মিডিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।”
তার কয়েকদিন পর ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই শরীয়তপুর পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে “মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ” শীর্ষক সুধী সমাবেশে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, ‘জঙ্গিবাদ একসময় ছিল একটা নাটক, এ নাটক থেকে আমরা পরিত্রাণ পেয়েছি। আমরা দীর্ঘ ১৮ বছর ফ্যাসিস্ট দ্বারা কবলিত ছিলাম। সেই ফ্যাসিস্ট থেকেও আমরা মুক্ত; আমরা নতুন বাংলাদেশের নতুন পুলিশ হিসেবে কাজ করছি।”
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার খবর
২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাক-আফগান সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযানে 'তেহরিকে তালিবান পাকিস্তান' (টিটিপি) এর ৫৪ সদস্য নিহত হন। ওই হামলায় টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করা আহমেদ জুবায়ের নামে এক বাংলাদেশি যুবকও নিহত হন। গত বছরের ১৫ মে দ্য ডিসেন্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সর্বপ্রথম তার মৃত্যুর খবরটি সর্বপ্রথম উঠে আসে। পরবর্তীতে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করা আরও কয়েকজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্ট। দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ পর্যন্ত টিটিপির হয়ে যুদ্ধরত অবস্থায় ৫ বাংলাদেশি যুবক ও পাকিস্তানের ড্রোন হামলায় এক শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি একতলা মাদ্রাসা ভবনে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মাদ্রাসা ভবনটির দুটি দেয়াল উড়ে যায় এবং নারী-শিশুসহ ৪ জন আহত হয়৷ পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৯টি তাজা বোমা, গ্যালন ভর্তি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, এসিটোন ও নাইট্রিক এসিডসহ ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, বোমা তৈরির পাউডার, শর্টগানের গুলিসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
এ ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে গত ৪ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিস্ফোরণের মূল হোতা আল-আমিনসহ অন্তত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। আল-আমিন আইএস মতাদর্শী ‘নিউ-জেএমবি’র সাথে যুক্ত বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে সন্ত্রাস দমন নিয়ে কাজ করা পুলিশের একাধিক সংস্থার সূত্র। ইতোপূর্বে আল-আমিনের নামে সন্ত্রাসবিরোধী ধারাসহ ৭টি মামলা ছিল। এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতারও করা হয়।
গত ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইলের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানায়, জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত তিন মাসে ৩৬ জন বাংলাদেশিকে আটক করে মালয়েশিয়ার পুলিশ। যাদের মধ্যে অনেকে কারখানা, নির্মাণ ও সেবাখাতে কর্মরত ছিলেন। এপ্রিল থেকে কয়েক ধাপে অভিযান চালিয়ে ৩৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা বাংলাদেশ ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট বা আইএস সদস্যদের অর্থায়ন করতো বলে জানিয়েছেন দেশটির পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ খালিদ ইসমাইল।
২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি পাকিস্তানী জঙ্গি সংগঠন টিটিপি এবং আল-কায়দার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ফয়সাল রহমান (২৫) এক বাংলাদেশি যুবককে দেশে ফেরত পাঠায় ইতালি সরকার। ২৬ জানুয়ারি দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৩ জানুয়ারি তাকে ইতালি পুলিশের প্রহরায় দেশে এনে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফয়সালের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ভাগলপুরে। উত্তরা বিমানবন্দর থানায় তার নামে ৫৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তার আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পালেরমোতে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি যুবককে আটক করেছে দেশটির পুলিশ। ইতালির বার্তা সংস্থা এএনএসএ’র বরাতে দৈনিক সমকালের একটি খবরে এটি জানানো হয়। এতে বলা হয়, আটককৃত দুই যুবকের নাম হিমেল আহমেদ (২১) ও মুন্না তফাদার (১৮)।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইতালিয়ান পুলিশ জানিয়েছে- অভিযুক্তদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ওসামা বিন লাদেনের ছবি ও প্রচারণামূলক উপাদান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে তারা কীভাবে সন্ত্রাসী হামলা চালানো যায়, তা নিয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছিল বলে ধারণা করছে তদন্তকারী দল।
গত ২৬ এপ্রিল টাইমস অব বাংলাদেশের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামে বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া একজন ওয়ারেন্ট অফিসারকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর একটি আস্তানায় খুঁজে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সরকারের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এখন পর্যন্ত ২০ জনেরও সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বিমানবাহিনীর ১২ জন সদস্য রয়েছেন—যাদের মধ্যে দুইজন অফিসার এবং বেশ কয়েকজন ওয়ারেন্ট অফিসার ও সৈনিক রয়েছেন। এছাড়া বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটির মসজিদের ইমামসহ ১০ জনের বেশি বেসামরিক ব্যক্তিকেও আটক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিমানবাহিনীর তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে, বাহিনীর ভেতরে গত কয়েক মাস ধরে কোনো নিয়োগ নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না, কোনো সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়েছে কি না এবং কোনো বাংলাদেশি নিয়োগপ্রাপ্তকে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে বিদেশে পাঠানো হয়েছে কি না। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম জহুরুল হক ঘাঁটিতে কর্মরত ওই ওয়ারেন্ট অফিসার প্রায় দুই মাস বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার পর এই তদন্ত শুরু হয়। পরে তাকে টিটিপি-র একটি আস্তানা থেকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তির পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব এবং বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক ছিল সোমবারের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সময়ে সরকার সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগের কথা বললেও বিরোধীদল জামায়াত রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
একাধিক বিল পাসকে কেন্দ্র করে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ নিয়ে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই সংসদে এসব বিল পাস হয়। বিলগুলোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়ার পর অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। বিরোধীদলের নেতারা এ ঘটনাকে সংসদের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ। বিভিন্ন পথসভা ও সমাবেশে উল্লেখযোগ্য জনসমাগমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ট্রেন্ডিং ছিল ছয় দফা দাবিতে বিরোধী জোটের এই লংমার্চ। একই দিনে সরকারি দল বিএনপি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় বিরোধীদের সমালোচনার মাধ্যমে পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস সংকট নিরসন, সারের কৃত্রিম সংকট দূর করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। কর্মসূচিকে ঘিরে এরই মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। লংমার্চের শেষ হবে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানের সমাবেশের মধ্য দিয়ে।