জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের বেশ কিছু ধারায় পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সময় বিভিন্ন স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’ শর্তটি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ওপর সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়।
সংসদে উত্থাপিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে বলা হয়েছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তকালীন বা পরবর্তী সময়ে কমিশন যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। পাশাপাশি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল।
সংসদীয় কমিটি এই ধারায় ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’ শব্দগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ফলে সংসদে সুপারিশটি গৃহীত হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সময় এসব স্থানে পরিদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
এ ছাড়া কমিশন গঠনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। মূল বিলে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকার বিধান ছিল। কমিটি একজন নারীর পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য রাখার সুপারিশ করেছে।
কমিশন গঠনের জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটিতেও নতুন সদস্য যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি অথবা তাঁর মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিককে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ নিয়ে সংসদে বিতর্ক
তবে বিলটির ওপর সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিতর্ক হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির বুধবার রাতে সংসদে প্রতিবেদনটি উত্থাপন করেন। প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়েছে, বিলটি পরীক্ষার সময় কমিটির সদস্যরা ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ করেন। সেখানে বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান ও আলফারুক আব্দুল লতিফের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিবেদনের আরেক অংশে বলা হয়েছে, বিলের ওপর আলোচনার শুরুতে বিরোধী দলের ওই দুই সদস্য বক্তব্য না দিয়ে কমিটি কক্ষ ত্যাগ করেন।
বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, তাঁরা কেন কমিটির আলোচনায় অংশ নেননি, তা বৈঠকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন এবং লিখিত বক্তব্যও দিয়েছেন। কিন্তু সেই বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ অন্য জায়গায় তাঁদের ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ করার কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।
জবাবে কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির সামনে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিস্তারিত আলোচনার আগে তাঁরা কক্ষ ত্যাগ করেন।
এরপর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের বিরোধিতা করে তাঁদের মতামত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন।”
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউটের নজির সম্ভবত এটিই প্রথম। বিরোধী দলের সদস্যরা যদি নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে তাঁদের বক্তব্য দিতেন, তাহলে তা প্রতিবেদনে থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাঁরা তা দেননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, “ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন—এটা কোর্টের বিষয়, সংসদের নয়।” তিনি বলেন, তাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু সেটি প্রতিবেদনে রাখা হয়নি। এ কারণে প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ বলে দাবি করে তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন এবং কমিটিকে তা পড়ে শুনিয়েছেন। তাই বিষয়টি প্রতিবেদনে থাকা উচিত।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, কমিটিতে সদস্যরা কে কী বলেছেন, সাধারণত তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় না। তবে ‘সক্রিয়’ শব্দটি বাদ দেওয়ার বিষয়টি স্পিকার বিবেচনা করতে পারেন।
জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিলটি পাসের আগে দফাওয়ারি আলোচনার সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। আলোচনার মাধ্যমে বিলটি অনুমোদিত হতে পারে।
গুম প্রতিরোধ বিলেও ওয়াকআউট নিয়ে আপত্তি
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তবে এই বিলে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়নি।
প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় আপত্তি জানান কমিটির সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বলেন, তাঁরা কেন ওয়াকআউট করেছিলেন, সে বিষয়ে কমিটির বৈঠকে তাঁদের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে ‘সক্রিয়’ শব্দটির ব্যবহার যথাযথ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিরোধী সদস্যদের ওয়াকআউটের বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রতিবেদনটি উপস্থাপিত হয়েছে।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সক্রিয়’ শব্দটি সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি কপি-পেস্টের মাধ্যমে এসেছে। ভবিষ্যতে শব্দটি থাকবে কি না, তা স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। বিরোধী দলের আপত্তি থাকলে বিল পাসের সময় তা উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
এর আগে নওশাদ জমির সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলের ওপর সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন।