বাংলাদেশের মক্কা চুক্তি ঘিরে দিল্লির বার্তা, ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব’
বাংলাদেশকে নজরে রাখছে ভারত

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে ঢাকার অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব উন্নয়ন তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশের নিরাপত্তা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক বাংলাদেশের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ কথা বলেন।
জয়সোয়াল বলেন, ‘ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে এমন সব ঘটনা আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’ তিনি আরও জানান, ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগে ২১ আগস্টও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জয়সোয়াল বলেছিলেন, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সব উন্নয়ন ভারত নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে চুক্তিটির ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা তারা পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের অবস্থান কী
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট মক্কায় ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে তিন দেশ নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতিতে সম্মত হয়েছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকেই এতে আরও কয়েকটি মুসলিম দেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নামও আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে সরকার জানিয়েছে, চুক্তির সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও সম্প্রতি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানালে ঢাকাকে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তবে আমন্ত্রণ পাওয়ার আগেই চুক্তিতে যোগদানের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করা আগাম হয়ে যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
তবে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেনি। ফলে বর্তমানে ঢাকার অবস্থানকে মূলত সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ হিসেবে নয়।
দিল্লির নজর কেন
বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হয়, তাহলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পাকিস্তান হওয়ায় ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
এর সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার সম্পর্কও যুক্ত রয়েছে।
এ কারণে বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দেবে কি না, সেই সিদ্ধান্তকে শুধু ঢাকার সঙ্গে তিন দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখছে না দিল্লি। বরং এর সম্ভাব্য প্রভাব ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর কীভাবে পড়তে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এর আগেও মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই ধরনের সতর্ক অবস্থান জানিয়েছে। ১১ আগস্ট জয়সোয়াল বলেছিলেন, চুক্তিটির প্রভাব ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং ভারতের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
‘বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত’
তবে বাংলাদেশ কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত—ভারতের পক্ষ থেকে এমন অবস্থানও জানানো হয়েছে।
দিল্লির বক্তব্যের মূল সুর হলো, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছে না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়তে পারে কি না, সেটি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
এ অবস্থান থেকেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য যোগদান প্রসঙ্গে জয়সোয়ালের বক্তব্যে সরাসরি আপত্তি বা বিরোধিতার কথা না থাকলেও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে দিল্লির সতর্ক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
চুক্তি ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক আগ্রহ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ছাড়াও মিসর, কাতার, কুয়েত, আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডানের মতো কয়েকটি দেশের নাম বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব দেশ চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য নেই।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত বিষয়টি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। আমন্ত্রণ এলে তা কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে দিল্লির সাম্প্রতিক অবস্থান বলছে, বাংলাদেশ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি শুধু ঢাকার অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের বিষয় হিসেবে দেখছে না ভারত। এর সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত ও আঞ্চলিক প্রভাবও তারা হিসাবের মধ্যে রাখছে।
ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি এখন ঢাকা-রিয়াদ, ঢাকা-আঙ্কারা কিংবা ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।









