১৭ বছরে দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী
‘দুর্নীতিমুক্ত’ স্থানীয় সরকার গড়ার ঘোষণা

বিগত ১৭ বছরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে প্রথম কর্মদিবসে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বিগত ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা এবং সরকারি সেবা তাদের দোরগোড়ায় যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতিমুক্ত করে এর পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৭ বছরে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে দুর্নীতি হয়ে থাকলে আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের আইন ও বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দরিদ্র মানুষের সেবায় অগ্রাধিকার
মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রায় ৫০টি মন্ত্রণালয় থাকলেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কাজের ধরন অন্য অনেক মন্ত্রণালয়ের চেয়ে আলাদা। কারণ, সরকারের মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা করা এবং এই মন্ত্রণালয় সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাও কার্যকর হবে। এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনগণের কাছে সঠিকভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলে এর সুফল শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুরো দেশ ও সরকার পাবে।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, দেশের সচ্ছল মানুষ নিজেদের অনেক প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষের বড় একটি অংশ সরকারি সহায়তা ও সেবার ওপর নির্ভরশীল। তাই দরিদ্র মানুষের অধিকার ও প্রয়োজন নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনোভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বিগত ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনায় তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘ক্ষমতার উৎস জনগণ’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হলেও এই ক্ষমতা সরকারের নিজস্ব নয়। জনগণই ক্ষমতার উৎস। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ যাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠায়, তারাই সরকার পরিচালনা করেন।
তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদেরও জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না করে তাদের সমস্যা বুঝে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বকে নিজের জন্য গুরুদায়িত্ব উল্লেখ করে মঈন খান বলেন, জনগণের সঙ্গে মিশে, তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সেবা করতে চান তিনি।
স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করার লক্ষ্য
মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের সেবাগুলো সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছায়। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হলে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের প্রয়োজনকে সামনে রেখে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতিমুক্ত করার পাশাপাশি এর পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে। সরকারি সেবায় যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয় থেকে রায় লিখে দেওয়ার হতো
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী অতীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগও তোলেন। তিনি বলেন, একসময় বিচারকদের স্বাধীনভাবে রায় লেখার সুযোগ ছিল না। মন্ত্রণালয় থেকে রায় লিখে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া। একইভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কেও জনগণের কাছে কার্যকরভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চান বলে জানান তিনি।
জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ
নিজের রাজনৈতিক আদর্শের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম জড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিল, তখন জিয়াউর রহমান সাহসের সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সম্মুখ সমরে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশবাসী তাঁকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন।
সবশেষে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা, অনিয়ম বা দুর্নীতি গ্রহণযোগ্য হবে না।









