মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি: ভারতের জন্য সুখবর, নাকি দুঃসংবাদ?

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক বৃহস্পতিবার সংসদে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ভারতের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে ফখরুল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ছিলেন। ফলে বঙ্গভবনে তাঁর অভিষেককে নয়াদিল্লি কীভাবে দেখছে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া শেখ হাসিনার জন্য ভালো খবর নয়। কারণ, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ছিলেন হাসিনা সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাঁর পদত্যাগের পর ফখরুলের মতো দীর্ঘদিনের বিএনপি নেতার রাষ্ট্রপতি হওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কঠোর অবস্থান
বিএনপির মহাসচিব থাকাকালে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল একাধিকবার বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। বিশেষ করে পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও ভারতের সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তির ক্ষেত্রে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্কের দাবি তুলেছেন তিনি।
ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন সমঝোতা ও যোগাযোগ প্রকল্পের সমালোচনা করে ফখরুল এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এসব ব্যবস্থার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে। রেল ও অন্যান্য যোগাযোগ করিডোর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, অংশীদারত্ব বা কানেক্টিভিটিতে আপত্তি নেই, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
পানি ইস্যুতেও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তিনি ভারতকে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
হাসিনাকে ঘিরে দিল্লি-ঢাকার টানাপোড়েন
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হতে পারে শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে নতুন বাংলাদেশ সরকার।
তবে ফখরুলের অবস্থান কেবল ভারতবিরোধী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি থাকলেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও উন্নয়নমূলক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে চায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ, তাঁর অবস্থানে ভারতবিরোধিতার চেয়ে বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে রেখে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ কারণেই ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়াকে সরাসরি ভারত-বিরোধী কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বে থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন।
গঙ্গা চুক্তি সামনে বড় পরীক্ষা
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা সমঝোতার প্রশ্ন সামনে আসছে।
ফখরুল এর আগে স্পষ্ট করে বলেছেন, গঙ্গা চুক্তি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে এই চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময় দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদ কতটা প্রভাব ফেলবে?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে এই পদটির গুরুত্ব বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফখরুলের ভূমিকা তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে ফখরুল এখন আর বিএনপির মহাসচিব নন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অতীত এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন ভূমিকার মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জন্য সুখবর, নাকি দুঃসংবাদ?
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া ভারতের জন্য একেবারে সুখবর নয়, আবার সরাসরি দুঃসংবাদও নয়। কারণ, তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলেননি। বরং বাণিজ্য, উন্নয়ন ও যোগাযোগের সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে আরও দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেছেন।
ভারতের জন্য মূল উদ্বেগ হতে পারে তিনটি জায়গায়—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, অভিন্ন নদীর পানি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্ন। এর সঙ্গে সীমান্ত ও বাণিজ্য ইস্যুও রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক বাস্তবতা, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফখরুলের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সংঘাতের পথে না নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থকে আরও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তাই দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় বার্তাটি সম্ভবত ভারতবিরোধিতা নয়; বরং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে দিল্লিকে নতুন বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হবে। আর সেই বাস্তবতায় বঙ্গভবনে বসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









