মূল্যস্ফীতির চাপে অতিরিক্ত কাজ, তবুও ব্যয় সামলাতে হিমশিম
নিজস্ব প্রতিবেদক২০ জুন, ২০২৬ এ ৯:৫৮ PM

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের বহু পরিবার এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ মেটাতে তরুণদের অনেকেই একাধিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ তিনটি পর্যন্ত কাজ করেও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন না। এমন বাস্তবতায় অনেক তরুণ খরচ কমাতে এক বেলা খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি মানুষের সহনশীলতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে, অথচ দেশে এখনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়নি।
শনিবার রাজধানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
ফারাহ কবির বলেন, বাংলাদেশের মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করার সক্ষমতার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলমান মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে তাদের সহ্যক্ষমতা প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, তরুণদের অনেকেই অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন, একাধিক পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, তবু জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে খাবার খরচ কমানোসহ বিভিন্ন ধরনের সমঝোতায় যেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বিক বাস্তবতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঢাকা শহরকে বিবেচনায় নিলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে না। তাঁর ভাষায়, “ঢাকা অনেকটাই বেলুনের মতো একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করেছে। এখানে রাত গভীর পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। কিন্তু এর বাইরে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবস্থা ভিন্ন। সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষ ভালো নেই।”
অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে। এর ফলে বাজেট ঘোষণার পরপরই বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি। তবে এই কর-সুবিধা অব্যাহত না থাকলে ভবিষ্যতে পণ্যমূল্য আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আবদুল মজিদ বলেন, বাজেট বক্তৃতা ও অর্থবিধিতে ঘোষিত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যাখ্যা দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারে এসব সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শুল্ক কমিয়ে দিলেই হবে না, এর সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি মনে করেন, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাবে না।
আলোচনায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে মধ্যবিত্তদের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেখা যায় না।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও একই সঙ্গে করহার বৃদ্ধির কারণে নিয়মিত করদাতাদের প্রত্যাশিত সুবিধা কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ফারাহ কবির বলেন, বর্তমানে বাজারে পণ্যের দাম নতুন করে খুব বেশি না বাড়লেও কয়েক বছর ধরে যে উচ্চমূল্য পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার প্রভাব এখনো কাটেনি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা ব্যবসায় মন্দাভাবের কথা জানান। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. মাইনুল ইসলাম, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক এবং মালালা ফান্ডের সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোশাররফ তানসেনসহ বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন। তাঁরা মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের সুরক্ষায় আরও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব এখন মধ্যবিত্ত ও তরুণ কর্মজীবী শ্রেণির জীবনেও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।









