দিল্লি বিমানবন্দরে জাহেদুর রহমানকে আটকে রাখা: কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনে ভারতের দায়

ভারতের দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদুর রহমানকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকে শুধু ইমিগ্রেশন জটিলতা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ঘটনাটি কূটনৈতিক রীতিনীতি, আয়োজকের দায়িত্ব এবং পারস্পরিক আস্থার জায়গায় প্রশ্ন তুলেছে।
কূটনৈতিক সূত্র ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ড. জাহেদ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি। বাংলাদেশ দিক থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও তালিকা আগেই ভারতকে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার তাকে গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ঘটনা প্রশাসনিক ভুলের চেয়ে কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি হিসেবে বেশি আলোচিত হয়েছে।
প্রতিটি রাষ্ট্রের অধিকার আছে নিজ ভূখণ্ডে কে প্রবেশ করবে তা ঠিক করার। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগেরও নিয়ম আছে। ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস ১৯৬১-এর মূল চেতনা হলো পারস্পরিক সম্মান ও কার্যকর যোগাযোগ। সরকারি প্রতিনিধি, বিশেষ করে আয়োজক দেশের আমন্ত্রণে আসা প্রতিনিধির ক্ষেত্রে আগে থেকে কোনো নিরাপত্তা বা ভিসা সংক্রান্ত আপত্তি থাকলে তা কূটনৈতিক চ্যানেলে জানানোই প্রচলিত রীতি। বিমানবন্দরে প্রকাশ্যে আটকে রাখা, হাইকমিশনার উপস্থিত থাকার পরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো—এগুলো সেই রীতির ব্যত্যয়। যদি প্রবেশে গুরুতর বাধা নাই থাকে, তবে দুই ঘণ্টার বেশি আটকানো অনাবশ্যক। আর যদি বৈধ আপত্তি থাকেই, তবে তা সম্মেলনের আগেই কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে জানানো উচিত ছিল। শেষ মুহূর্তের জনসমক্ষে জটিলতা আয়োজক দেশের দায়িত্বহীনতা হিসেবেই দেখা হয়।
এই ঘটনার পর যে ধারণা জন্মেছে তা হলো, পূর্বে জানানো সত্ত্বেও একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে আলাদা মানদণ্ডে দেখা হয়েছে। ড. জাহেদ ভারতের নীতি নিয়ে মাঝে মাঝে সমালোচনামূলক অবস্থান নেন। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তার রাজনৈতিক মতামত কি আচরণকে প্রভাবিত করেছে। এই ধারণা ভারতের জন্য কূটনৈতিক ক্ষতি। কারণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভাবমূর্তি নির্ভর করে নিরপেক্ষতা ও সংবেদনশীলতার ওপর। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, যোগাযোগ—সব জায়গায় নতুন করে কাজ করার চেষ্টা করছে। এমন সময়ে একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধির সঙ্গে বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে পেছনে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে ঘটনাটি পুরোনো এক অনুভূতিকে উসকে দেয়—ভারত এখনো অনেক সময় বাংলাদেশকে সমান মর্যাদার অংশীদার হিসেবে আচরণ করে না। এই অনুভূতি কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে জনমানসে বেশি প্রভাব ফেলে।
কূটনৈতিক প্রটোকল বলে, আমন্ত্রিত সরকারি প্রতিনিধির তালিকা আগেই পাওয়ার পর আয়োজক দেশের দায়িত্ব হলো সব ছাড়পত্র আগেই নিশ্চিত করা। সমস্যা থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা বা ভদ্র ভাষায় অপারগতা জানানো। বিমানবন্দরে আটকে রাখা হলো সবচেয়ে দুর্বল পদ্ধতি। সম্মেলনের আয়োজক ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দায়িত্ব ছিল অংশগ্রহণকারীদের মসৃণ প্রবেশ নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্বে ঘাটতি থাকলে তা আয়োজক দেশের ব্যর্থতা। ড. জাহেদ ব্যক্তি হিসেবে কারও সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। কিন্তু তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি—বাংলাদেশ সরকার—সেই প্রতিষ্ঠানের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়া দুই দেশের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত বিব্রতকর ঘটনা হিসেবে না দেখে কূটনৈতিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ভবিষ্যতে আস্থা ফেরাতে দুই পক্ষেরই করণীয় আছে। ভারতের জন্য আয়োজক হিসেবে আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিয়ে পূর্ব-সমন্বয় জোরদার করা দরকার। কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলে তা আগেই কূটনৈতিক চ্যানেলে স্পষ্ট করতে হবে। বিমানবন্দরে প্রকাশ্য জটিলতা এড়িয়ে সম্মানজনক বিকল্প রাখতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সব প্রতিনিধির ভ্রমণ-সংক্রান্ত নথি ও যোগাযোগ দ্বিগুণ যাচাই করা জরুরি। হাইকমিশনের মাধ্যমে আগাম কনফার্মেশন নেওয়া এবং ঘটনার পর দ্রুত, তথ্যভিত্তিক কূটনৈতিক যোগাযোগ করে ভুল বোঝাবুঝি কমানো প্রয়োজন।
ভালো প্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে ওঠে অর্থনৈতিক চুক্তি দিয়ে, টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীলতায়। দিল্লির বিমানবন্দরের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, বড় শক্তি হতে গেলে শুধু সামরিক বা বাণিজ্যিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়, ছোট আচরণেও দায়িত্বশীলতা দেখাতে হয়। এবার দায়িত্ব ভারতের। আয়োজক হিসেবে যে সংবেদনশীলতা দেখানো হয়নি, তা পরের পদক্ষেপে দেখাতে হবে। নইলে এক ঘণ্টার বিমানবন্দর জটিলতা, দুই দেশের সম্পর্কের বছরের অগ্রগতিকে ম্লান করে দিতে পারে।









