ডা. জাহেদের দিল্লি যাত্রায় ‘বাধা’, এক ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ
ক্ষোভ নিয়ে ফিরলেন দেশে

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি গিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ না করেই দেশে ফিরেছেন। নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি ভারতে না ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রোববার ঢাকা থেকে দিল্লি যান ডা. জাহেদ উর রহমান। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তার তথ্য যাচাইয়ের সময় অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সূত্রের ভাষ্য, তার নাম একটি নজরদারি তালিকায় থাকায় নিয়মিত যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
তবে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত কোনো অসম্মান করার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সফরসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
এক ঘণ্টা অপেক্ষা, পরে প্রবেশের অনুমতি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ডা. জাহেদকে আলাদা করে বসিয়ে রাখা হয়। এ সময় তার সফরের উদ্দেশ্য, পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
প্রায় এক ঘণ্টার যাচাই-বাছাই শেষে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় নিজের প্রতি আচরণকে স্বাভাবিক মনে করেননি ডা. জাহেদ। এরপর তিনি ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র জানায়, তাকে ভারতে প্রবেশের জন্য অনুরোধ করা হলেও তিনি সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। পরে ভারত থেকে অন্য একটি দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।
নজরদারি তালিকায় ছিল নাম
ঘটনার পেছনে ডা. জাহেদের নাম ভারতীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরদারি তালিকায় থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত কয়েকজন বাংলাদেশি অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে ভারতবিরোধী প্রচার রয়েছে। ওই তালিকায় ডা. জাহেদ উর রহমানের নামও ছিল বলে জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, উপদেষ্টা হিসেবে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদার অধিকারী এবং কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য হলেও এবার তিনি সাধারণ পাসপোর্টে ভ্রমণ করছিলেন। ফলে আগের তথ্যের সঙ্গে তার পরিচয় মিলে যাওয়ায় ইমিগ্রেশন পর্যায়ে বাড়তি যাচাইয়ের মুখে পড়তে হয়।
ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত নজরদারি তালিকায় নাম থাকায় নিয়মিত অভিবাসন যাচাইয়ের সময় তার তথ্য শনাক্ত হয়। এরপর বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়।
হাইকমিশনের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে ঘটনার পর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির বিদেশ সফরের আগে সফরের বিস্তারিত তথ্য, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ যথাযথভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তাদের মতে, সফরসংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পৌঁছালে বিমানবন্দরে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল।
তবে হাইকমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
‘অসৌজন্য’ নাকি প্রশাসনিক জটিলতা?
ডা. জাহেদের দিল্লি সফরের ঘটনা নিয়ে দুই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। এক পক্ষের মতে, এটি একজন সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে অপ্রত্যাশিত আচরণের ঘটনা। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি মূলত অভিবাসন যাচাই ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের জটিলতা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা সংবেদনশীল। কোনো ভুল বোঝাবুঝি যাতে বড় কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত না হয়, সে জন্য উভয় পক্ষের দ্রুত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ প্রয়োজন।
তাদের মতে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিদেশ সফরে সমন্বয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সীমান্ত ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজন সরকারি প্রতিনিধির সফর ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।









