ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ, পাল্টা আক্রমণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
‘জামায়াত ইসলাম নয়, ইসলামী ব্যাংকও ইসলাম নয়’

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মালিকানা, শেয়ার কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাতীয় সংসদে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ব্যাংকটির শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি তোলা হলে জবাবে কড়া ভাষায় পাল্টা আক্রমণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলাম ইসলাম নয়, ইসলামী ব্যাংকও ইসলাম নয়।’ একই সঙ্গে অতীতে ব্যাংকটি দখল, নিয়োগ-বাণিজ্য, ঋণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে ব্যাপক তদন্তেরও ঘোষণা দেন তিনি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আওতায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের বিষয়ে একটি নোটিশ উত্থাপন করেন। এ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন বলা হচ্ছে সরকার ব্যাংকের মালিকানা কেড়ে নিচ্ছে, আবার একই সঙ্গে ইসলামের ওপর আঘাত হানার অভিযোগও তোলা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। জনাব ফখরুল ইসলাম ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়। একটি ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটাকে ইসলামের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।’
তিনি দাবি করেন, অতীতে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে, তকবির দিয়ে দখল করা হয়েছিল, সেই দখল যদি বেদখল হয়ে যায়, তার যাতনা আমরা বুঝি।’
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংকটির রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা নির্বাচনের আগে বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়। পরে আমদানি করা পণ্য বিক্রি করা হলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘দুষ্টু লোকেরা বলে, এই অর্থ কোনো একটি দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, নাবিল গ্রুপের মোট ব্যাংক দায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এসব বিষয়ে তদন্ত হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের আগে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের আড়ালে বিভিন্ন ব্যক্তির বিমান ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়ও ব্যাংকের অর্থে বহন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে জানান।
ব্যাংকটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর প্রায় ৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। একই সময়ে প্রায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁদের অধিকাংশই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী। এছাড়া প্রায় ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার অনেকগুলোই নিয়ম ও যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ না করেই দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘এই অনিয়মগুলো হয়েছে। ইসলামের নামেই হয়েছে বলে মনে হয়। সুতরাং তদন্ত হলে হয়তো অনেকের নাম সামনে আসতে পারে।’
ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার কাঠামো নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কীভাবে শেয়ার অর্জন করেছে, সেটি আলাদা তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে বৈধভাবে যাঁরা শেয়ারধারী, তাঁদের অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার। শেয়ার কীভাবে কেনা হয়েছে, সেটা নিয়ে তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। কিন্তু বৈধ শেয়ারধারীর অধিকার বহাল থাকবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ইবনে সিনা ট্রাস্টের মালিকানাধীন প্রায় ২ শতাংশ শেয়ার ব্লক মার্কেটে বাজারদরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি মূল্যে বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮১ শতাংশ শেয়ার একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, সেই তথ্য প্রকাশের দাবি জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বৈধ ও প্রকৃত শেয়ারধারীদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এ সময় অতীতে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থপাচারের অভিযোগও সামনে আনেন তিনি। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শুধু একটি গোষ্ঠী নয়, যারা দেশের মানুষের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, সবার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো তদন্তও চলমান নেই। তবে নতুন কোনো অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার কাঠামোয় সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে প্রকৃত শেয়ারধারীদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়েই সরকারের পক্ষ থেকে কড়া অবস্থান তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংসদে এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয় এবং ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও অতীতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।







