খুরশীদকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা, দ্বিতীয় দিনেও ইসলামী ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ
পদত্যাগ না করলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল ও পদত্যাগের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যাংককে আবারও বিতর্কিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় খুরশীদ আলমকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে জীবন দিয়েও তাকে ব্যাংকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
মঙ্গলবার (২ জুন) রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলা হয়।
সকাল ৯টা থেকেই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং বক্তব্যের মাধ্যমে চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগের বিরোধিতা করেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান ও সাজোয়া যান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট কাটিয়ে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নতুন করে এমন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে, যাকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ও বক্তব্য ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তারা দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেশের আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানান। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের রাতের বেলায় কোনো বোর্ড সভা আয়োজন না করার আহ্বান জানান। তাদের ভাষ্য, ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করতে হবে।
এর আগে সোমবার একই দাবিতে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ওইদিন তাদের কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। এতে কয়েকজন আহত হন বলেও দাবি করা হয়। যদিও এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
সোমবারের আন্দোলনের কারণে ইসলামী ব্যাংকের নির্ধারিত পরিচালনা পর্ষদের সভা সশরীরে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পরে রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সভা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় পাঁচজন পরিচালক অংশ নেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ভার্চুয়াল ওই সভায় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের জমা দেওয়া পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আলতাফ হোসাইন ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান এই উত্তেজনা শুধু চেয়ারম্যান নিয়োগ বা সাবেক এমডির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে নয়; বরং ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা কাঠামো নিয়েও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের দাবি, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং সরকার আবারও এস আলম গ্রুপকে ইসলামী ব্যাংকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একসময় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ জামায়াতপন্থি উদ্যোক্তাদের হাতে থাকলেও ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে যায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৮৫ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠে। তদন্তে ওই অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক অন্যতম। প্রথমে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান করা হয় সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে। পরে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
এরপর অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে শুরু থেকেই তার নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছিল সচেতন গ্রাহক ফোরাম। গত ২৪ মে তিনি পদত্যাগ করলে একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুক খানও পদত্যাগে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের পর থেকেই বিভিন্ন ব্যানারে তার বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করে আসছেন একদল গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার। এরই ধারাবাহিকতায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো মঙ্গলবারও ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।









