মদিনা সনদের কথা বলে বিএনপি ‘ইসলামবিরোধী’ আইন করছে: জামায়াত
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বাতিলের দাবি

‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ অভিযোগ তুলে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের আগে মদিনা সনদের কথা বলে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিএনপি ক্ষমতায় এসে এখন ‘ইসলামবিরোধী’ আইন করছে। এ ধরনের আইন প্রণয়নের ‘দুঃসাহসের করুণ পরিণতি’ সরকারকে ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন পাসের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল থেকে এসব কথা বলেন জামায়াতের নেতারা। মিছিলটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড় ঘুরে বিজয়নগরে গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে প্রধান বক্তা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করবে না এবং মদিনা সনদের আলোকে দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারাই কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করেছে।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ হিসেবে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ওয়াকআউট করেছেন। এরপরও সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন পাস করেছে। ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করে সরকার যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, এর করুণ পরিণতি সরকারকে ভোগ করতে হবে।’
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে আইনমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। তাঁকে তাঁর বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাঁর ভাষ্য, আইনমন্ত্রী ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইনসহ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইনও বাতিল করতে হবে। এসব আইন জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী বলে দাবি করেন তিনি।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন ‘গণবিরোধী’। তাঁর অভিযোগ, সরকার ইসলামবিরোধী ও গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। সরকার ফ্যাসিস্ট হতে না চাইলে এসব আইন বাতিল করা উচিত।
জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করেই সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস করেছে। আইনমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওই বক্তব্যের পর আইনমন্ত্রীর পদে থাকার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন মেনে নেওয়া হবে না। বাবা-মায়ের অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন করে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়। বিলটির মাধ্যমে দান করা সম্পত্তিতে দাতা—বিশেষ করে বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর—জীবদ্দশায় ভোগদখল বা জীবনস্বত্ব বজায় রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার অব্যাহত থাকবে এবং আইন অনুযায়ী তা গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে।
বিলটি নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি ওঠে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী দাবি করে ভোট বর্জন ও ওয়াকআউট করা হয়। তবে সরকারপক্ষের বক্তব্য, বিদ্যমান আইনে দান করা সম্পত্তিতে দাতার আজীবন ভোগদখলের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান ছিল না। নতুন বিধানটি সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং মুসলিমদের হেবা, অসিয়ত বা অন্যান্য বৈধ হস্তান্তরব্যবস্থায় কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার ও হেবা মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর বিধানকে উপেক্ষা করা যাবে না। তাঁরা অবিলম্বে আইনটি বাতিলের পাশাপাশি ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ, আলেম ও মুফতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের দাবি জানান।









