নাগরিকত্ব ছাড়তে আবারও তৎপর এস আলম, সরকারের কড়া নজর
অর্থ পাচার ও আন্তর্জাতিক মামলার চাপ

অর্থ পাচার, ব্যাংক ঋণ অনিয়ম ও আন্তর্জাতিক সালিসি মামলার জটিলতার মধ্যেই আবারও নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন করেছেন শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)।তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদনও করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন করে আবেদন জমা দেন তাঁরা। তবে চলমান অর্থ পাচার তদন্ত, ঋণ অনিয়ম এবং আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা বিবেচনায় সরকার আপাতত এ আবেদন অনুমোদনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) সম্প্রতি আবারও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদনও করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। তবে সরকার মনে করছে, এ আবেদন অনুমোদন করা হলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, দেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেছেন। ফলে নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন হলে সরকারের আইনি অবস্থানও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এর আগে ২০২০ সালেও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন এস আলম। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার আবেদনটি অনুমোদন করেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্মারকে উল্লেখ করা হয়, সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে তাঁর নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছিল।
তবে পরে ইসলামী ব্যাংক ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। আদালত ওই স্মারকের কার্যকারিতা স্থগিত করলে সাইফুল আলমের নাগরিকত্বের বিষয়টি নতুন করে আইনি জটিলতায় পড়ে। ফলে বর্তমানে তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থান এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংক দখল, ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের সঙ্গে এস আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিদেশে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি আর দেশে ফেরেননি।
গত বছরের নভেম্বরে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দাবি করেছিলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
এদিকে এস আলমের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ইসলামী ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ইতোমধ্যে এস আলমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি দিয়েছে সংস্থাটি।
আওয়ামী লীগ আমলে নেওয়া নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা রিটের আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ূম প্রথম আলোকে বলেন, সাইফুল আলম যদি ২০২০ সালেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকঋণ নিয়েছেন—সে প্রশ্ন সামনে আসে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় সুবিধা নেওয়া এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবেও নতুন আবেদনটি করা হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন নিয়ে গত ৩ এপ্রিল সরকারের সাতটি সংস্থার কাছে মতামত চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, পুলিশের বিশেষ শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ডিজিএফআই।
চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আর্থিক দায় রয়েছে কি না এবং নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন মঞ্জুর হলে সরকার কী ধরনের জটিলতায় পড়তে পারে।
এদিকে গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সালিসি মামলা করেন সাইফুল আলম। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সরকার তাঁদের সম্পদ জব্দ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।
আইনি নথি অনুযায়ী, এস আলম পরিবার দাবি করেছে তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। তাঁদের দাবি, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে তাঁদের বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক চুক্তির সুরক্ষার আওতায় পড়ে।
তবে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সাইফুল আলম আসলে সাইপ্রাস নাকি সিঙ্গাপুরের নাগরিক। কারণ ২০২০ সালে তিনি সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের তথ্য দেখিয়ে আবেদন করেছিলেন। আবার আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে দাবি করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিতে হলে সাধারণত আগের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সাইফুল আলম সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন কি না কিংবা কবে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হয়েছেন—সে বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
এদিকে আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে লড়তে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। আগামী ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুনানিতে অংশ নিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তর থেকে এস আলম পরিবার–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।









