সীমান্তে থামছে না মৃত্যু, কূটনীতি কি যথেষ্ট?
বিএসএফের গুলিতে ৬২৫ প্রাণ

মাত্র কয়েকদিন আগেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় রাতের অন্ধকারে পড়ুয়া মোরসালিন আর নবী হোসেনের গায়ে গুলি বিদ্ধ করেছিল ভারতীয় বিএসএফের সেনারা। মোরসালিন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে কিছু হবে। অথচ তার ঘুম ভাঙল না আর। শুধু তারা দুজন কেন? গত ১৫ বছরে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ৬২৫ জন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে শিশু ও কিশোর আছে ২৫ জন। এরপরও কি আমরা চুপ করে থাকব?
চলুন সংখ্যাগুলো দেখি। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন বাংলাদেশি। ২০২৪ সালে মৃতের সংখ্যা ৩০ জন। আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৪ জন। মাত্র গত তিন বছরে ৯৫ জন আমাদের ভাই-বোন চোখের সামনে হারিয়ে গেছে। আর ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৬৩ জন। প্রতিবছর দিল্লি বলে ‘শূন্য সীমান্ত হত্যার প্রতিশ্রুতি’। কিন্তু মাঠের ছবি উল্টো।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সম্প্রতি একথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমরা আর মাথা নত করব না। সীমান্ত আর সেই শেখ হাসিনা আমলের মতো থাকবে না। এই বাংলাদেশ আর সে কঠিন সময়ের বাংলাদেশ নয়।” তার কথার সুরে স্পষ্ট—এখন সরকার বসে দেখবে না। হুমায়ুন কবির আরও বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারে ভয় পায় না। বাংলাদেশ সরকারও কাঁটাতারে ভয় পায় না। যেখানে প্রয়োজন সেখানে আমরা কথা বলব।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু কথা বলে কি হবে? আমাদের বাস্তব ও কূটনৈতিক কৌশল দরকার।
গত ৮ মে রাতে কসবা উপজেলার ধাজানগর-পাথরিয়াদওয়ার সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১৫ জন বাংলাদেশি চোরাকারবারি ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহায়তায় প্রায় ২০০ গজ ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। ফেরার পথে বিএসএফের সাথে ধস্তাধস্তি হয়। বিএসএফের গুলিতে মোরসালিন আর নবী হোসেন মারা যান। বিএসএফ দাবি করেছে, চোরাকারবারিরা প্রথমে আক্রমণ করে। কিন্তু আমরা কি শুধু এই গল্পেই থামি? আমাদের মনে রাখতে হবে এই দুই যুবক শুধু অপরাধী ছিল না; তারা ছিল কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান, কোনো মায়ের আদরের ছেলে। তাদের মৃত্যু কষ্ট দেয়।
ভারত ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের ৩,২৩২ কিলোমিটারে ইতিমধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। বাকি আছে মাত্র ১৭৩ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু যেখানে বেড়া বসেছে, সেখানেই মৃত্যু হয়েছে। দ্যা ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫-এ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন—৪৫ দিনের মধ্যে জমি দিয়ে দেওয়া হবে বিএসএফকে। নতুন করে বেড়া দেওয়া হবে। "অথচ গত জানুয়ারিতে মালদহের সুকদেবপুরে এক সারি কাঁটাতার বসাতেই বাকবিতণ্ডা বেধেছিল বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে
হুমায়ুন কবির বলেছেন, “ভারতের রাজ্য সরকারের বক্তব্য নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হতে পারে। শাসনের বাস্তবতা ভিন্ন।” সেটা সত্যি। কিন্তু আমরা অপেক্ষায় না থেকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেব কীভাবে?
প্রথমত, তথ্য যুদ্ধ জিততে হবে। প্রতি মাসে ঠিক কত বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে, কোথায় মারা যাচ্ছে—তার জবাব দিতে হবে জাতিসংঘ ও অন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে। উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির যথার্থই বলেছেন, “উত্তরপ্রদ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ভাষ্য চরম হতে পারে, কিন্তু সীমান্ত নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেই হবে।”
দ্বিতীয়ত, পানি ও উন্নয়নে চীনকে বিকল্প রাখতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান সম্প্রতি চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কথা এগিয়েছেন। চাইনিজ এক্সিম ব্যাংক অর্থায়ন দিতে রাজি। ভারত ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অজুহাতে চুক্তি আটকে দিয়েছিল। সেটা চল্লিশ বছর ধরে বাংলাদেশকে পানির কষ্টে ফেলে রেখেছে। এখন পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রে বিজেপি থাকায় হুমায়ুন কবির আশা করছেন, “এবার বাধা কম হবে।” কিন্তু সেই আশার ওপর নির্ভর না করে আমাদের নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়াই আসল কূটনীতি।
তৃতীয়ত, সীমান্তের মানুষকে সচেতন করতে হবে। অনেক যুবক অর্থের লোভে, বেকারত্বের জ্বালায় সীমান্ত পেরোয়। বিএসএফের গুলির সঠিক তথ্য যদি গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যায়, তাহলে আত্মরক্ষার বোধ তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা বলেছেন, “আমরা আর নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে বসে থাকব না।” এটি একটি বড় প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বিএসএফের প্রতিটি গুলির ঘটনায় প্রতিবাদ নোটের পাশাপাশি পতাকা বৈঠকের ব্যবস্থা করতে পারে। মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়াতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
হুমায়ুন কবির বলেছেন, “যে দরজা খোলা থাকে, সেখানে সংলাপে সমাধান সম্ভব।” তাই চিৎকার নয়, কূটনীতি আর তথ্যের ওপর ভর করে কথা বলতে হবে। কাঁটাতার মানে শুধু লোহার বেড়া নয়—সেটা যন্ত্রণার চিহ্ন। সেই চিহ্নের ওপারে আমাদের মানুষ মরে। মোরসালিনের বয়সী যুবকেরা আজ রাস্তায় নেমেছে। তাদের কণ্ঠে চিৎকার: “আর না, আর নয়।”
এই বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নয়। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা একথা বারবার বলছেন, সেটা শুধু বক্তব্য নয়, এটি আমাদের নতুন জাতীয় সত্তার ঘোষণা। আমরা হব দৃঢ়, কিন্তু বদমেজাজি নয়। কূটনীতি মানে দালালি না করে স্বার্থে বন্ধুত্ব। বিএসএফের গুলি যেন আর কোনো মাকে সন্তানশোক না দেয়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি—আমরা পেছনে ফিরে যাব না। সীমান্তে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেউ কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখতে পারবে না। এবার আমরা সবাই জেগে আছি। আমরা মাথা নত করব না কারও সামনে।









